1. Inhalt
  2. Navigation
  3. Weitere Inhalte
  4. Metanavigation
  5. Suche
  6. Choose from 30 Languages

বাংলাদেশ

আলোচনায় বিমান, সমালোচনায় বিমান

২৭শে নভেম্বর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বিমান বাংলাদেশের একটি ফ্লাইটে বুদাপেস্ট যাচ্ছিলেন৷ কিন্তু যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে তুর্কমেনিস্তানে জরুরি অবতরণে বাধ্য হয় বিমনটি৷ এরপর দীর্ঘ চারঘণ্টা লাগে ত্রুটি সারাতে৷

Biman Bangladesh Airlines ARCHIVBILD (picture alliance/Asian News Network)

বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স

বিমানে প্রধানমন্ত্রী ও তাঁর সফরসঙ্গীসহ ৯৯ জন যাত্রী এবং ২৯ জন ক্রু ছিলেন৷ তাই এই ঘটনা বাংলাদেশে তুমুল হইচই ফেলে দেয়৷ গঠন করা হয় তদন্ত কমিটি৷ জানা যায়, ‘রাঙা প্রভাত' নামের বোয়িং ৭৭৭-৩০০ ইআর বিমানটির ফুয়েল ট্যাংকারের নাট-বোল্টু ঢিলা থাকায় ফুয়েল প্রেসার কমে যায় এবং তার ফলে ঐ বিপত্তি ঘটে৷ এরইমধ্যে এই  যান্ত্রিক গোলযোগ (নাকি ইচ্ছাকৃত অবহেলা?)-এর জন্য বিমানের ছয় কর্মকর্তা-কর্মচারীকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে৷ ঘটনারতদন্ত এখনো চলছে৷

এ ঘটনায় বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স বড় ধরনের একটি ঝাঁকুনি খেয়েছে সত্যি, কিন্তু তাতে কি বিমানের চরিত্র বদলাবে? বিমানের যাত্রীসেবা, ব্যবস্থাপনা এবং সময়জ্ঞান নিয়ে অভিযোগ বহু পুরনো৷ বিমান যেন লোকসান আর অব্যবস্থাপনার প্রতিশব্দে পরিণত হয়েছে৷

অডিও শুনুন 06:08

‘‘বিমান এখন লাভের মুখ দেখতে শুরু করেছে’’

শুরুর দিনগুলো...

১৯৭২ সালের ৪ঠা জানুয়ারি স্বাধীন বাংলাদেশে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের যাত্রা শুরু৷ বিমান বাহিনীর কাছ থেকে পাওয়া একটি ডিসি-৩ উড়োজাহাজ দিয়ে প্রথম ফ্লাইট পরিচালনা করা হয়, যা কিনা শুরু হয় অভ্যন্তরীণ রুটে যাত্রী পরিবহণের মধ্য দিয়ে৷ শুরু থেকেই পুরোপুরি একটি সরকারি প্রতিষ্ঠান হিসেবে পরিচালিত হচ্ছিল বিমান৷ ১৯৭৭ সালে বিমানকে একটি পাবলিক সেক্টর কর্পোরেশনে পরিণত করা হয়৷ এরপর অব্যাহত লোকসান আর বাড়তি জনবল কমাতে ২০০৭ সালে বিমানকে একটি পাবলিক লিমিটেড কোম্পানিতে পরিণত করা হয়৷ বর্তমানে বিমান বাংলাদেশ একটি বোর্ডের মাধ্যমে পরিচালিত হচ্ছে৷

২০০৭ সালে কোম্পানিতে রূপান্তরিত হওয়ার পর, ২০০৭-৮ ও ২০০৮-৯ অর্থবছরে মুনাফা অর্জন করতে সক্ষম হয় বাংলাদেশ বিমান৷ কিন্তু পরবর্তী আর্থিক বছরগুলোয় বিমান লোকসানের সম্মুখীন হয়৷ গত পাঁচবছরে বিমানের এক লাখ ৩৪ হাজার ৮৮২ কোটি টাকা লোকসান হয়েছে বলে খবর৷

বিমান ২০০৯-১০ অর্থবছরে চার হাজার ৬০২ কোটি, ২০১০-১১ অর্থবছরে ২২ হাজার ৪১৬ কোটি, ২০১১-১২ অর্থবছরে ৫৯ হাজার ৪২১ কোটি, ২০১২-১৩ অর্থবছরে ২৮ হাজার ৫৬৩ কোটি এবং ২০১৩-১৪ অর্থবছরে ১৯ হাজার ৮৮০ কোটি টাকা লোকসান করেছে৷ যদিও বিমান কর্তৃপক্ষের দাবি, ‘‘বিমান এখন লোকসানের ধকল কাটিয়ে লাভের মুখ দেখতে শুরু করেছে৷ গত অর্থবছরে বিমান ২৭২ কোটি টাকা লাভ করেছে৷ এই অর্থবছরেও লাভ করবে বলে আশা করি৷''

বিমান বাংলাদেশ: কেমন উড়াল?

বিমানের মান ও সময়জ্ঞান নিয়ে যাত্রীদের মধ্যে নানা গল্প প্রচলিত আছে৷ কেউ কেউ বলেন, বিমানে যাত্রা মানে অনিশ্চিত যাত্রা, কারণ, ঠিক সময়ে বিমান যাত্রা করার ঘটনা নাকি বিরল, ঠিক সময়ে গন্তব্যে পৌঁছানো তো পরের কথা৷

যুক্তরাজ্যের বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ (সিএএ) হিথ্রো বিমানবন্দরে কার্যক্রম পরিচালনাকারী এয়ারলাইন্সগুলোর সময়ানুবর্তিতার তথ্য প্রকাশ করে নিয়মিতভাবে৷ তাতে দেখা যায়, ২০১৩ সালের এপ্রিল থেকে গত বছরের মার্চ পর্যন্ত হিথ্রো বিমানবন্দরে ফ্লাইট পরিচালনাকারী এয়ারলাইন্সগুলোর মধ্যে সময়ানুবর্তিতায় সবচেয়ে খারাপের তালিকায় রয়েছে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স৷ ঐ সময় বিমান মোট ফ্লাইট পরিচালনা করেছে ৩১৪টি৷ এসব ফ্লাইটে গড় বিলম্ব ৪৫ দশমিক ৬ মিনিট৷ ২০০৮ সালে বিমানকে বিশ্বের সবচেয়ে খারাপ একটি এয়ারলাইন্স হিসেবে চিহ্নিত করে টাইম ম্যাগাজিন৷ একই বছর বিমানের নিরাপত্তা, সময়সূচি ও ব্যবস্থাপনার নেতিবাচক দিক বিবেচনা করে জাতিসংঘ তার কর্মীদের বাংলাদেশ বিমানে ভ্রমণে সতর্কতা জারি করে৷

বিভিন্ন এয়ারলাইন্সের যাত্রীসেবা, সময়নুবর্তিতাসহ নানা দিক বিচেনা করে রেটিং করার অনলাইনভিত্তিক প্রতিষ্ঠান ‘স্কাইট্র্যাকস' গত বছরের আগস্টে তাদের প্রতিবেদনে বিমান বাংলাদেশ এয়াললাইন্সকে বিশ্বের সবচেয়ে খারাপ এয়ারলাইন্স হিসেবে চিহ্নিত করেছে৷ যুক্তরাজ্যভিত্তিক এই প্রতিষ্ঠানটির ফাইভ স্টার রেটিং পদ্ধতিতে বিমান পায় টু-স্টার৷ যাত্রীসেবায় বিমান পায় ১০ এর মধ্যে মাত্র ৫৷ এর মানে হলো, বিমানের যাত্রী সেবা পুরোপরি অব্যবস্থাপনায় ভরা৷

ক'টা ফ্লাইট, কোথায় কোথায়?

অডিও শুনুন 01:52

‘‘আমরা বিমানের যাত্রীসেবা বাড়াতে নানা উদ্যোগ নিচ্ছি’’

বিমান বিশ্বের বিভিন্ন দেশের ২২টি গন্তব্যে ফ্লাইট পরিচালনা করে৷ অভ্যন্তরীণ রুট চারটি৷ চারটি নতুন বোয়িং – ৭৭৭ এয়ারক্রাফটসহ মোট ১২টি এয়ারক্রাফট দিয়ে বিমান তার এই সেবা দেয়৷ ২০০৭ সালে বিমানকে পাবলিক লিমিটেড কোম্পানিতে রূপান্তর করার সময় বোয়িং কোম্পানি থেকে ১০টি নতুন উড়োজাহাজ কেনার উদ্যোগ নেয়া হয়৷ ২০১৯ সালের মধ্যে আরও পাঁচটি উড়োজাহাজ বিমান বহরে যুক্ত হবে৷

১৯৯৬ সালে বাংলাদেশ বিমানে উড়োজাহাজের সংখ্যা ছিল নয়টি৷ তা ব্যবস্থাপনায় কর্মকর্তা-কর্মচারী ছিল ৫ হাজার ২৫৩ জন৷ এখন ১২টি বিমান নিয়ে বিমানের কর্মকর্তা-কর্মচারীর সংখ্যা ৩,৪০০ জন৷ আগে লিজে বিমান নেয়ার নামে ব্যাপক দুর্নীতি হয়েছে৷ এখনো দুর্নীতির অভিযোগ আছে রক্ষণাবেক্ষণ খাতে৷

তবে বাংলাদেশ বিমানের কর্মচারী লীগের সভাপতি মুশিকুর রহমান ডয়চে ভেলেকে বলেন, ‘‘অনেকেই না বুঝে বিমানে কর্মচারী প্রয়োজনের তুলনায় বেশি – এই কথা বলেন৷ বিমানে ৩,৪০০ কর্মচারী হলেও এদের মধ্যে ১,০০০ কর্মচারী কাজ করেন বিমান ক্যাটারিংয়ে৷ আর বিমানের আছে পোল্ট্রি, ওষুধ কারাখানা, গ্রাউন্ড হ্যান্ডেলিং৷ এসব সেক্টরে আরো ১,০০০ কর্মচারী কাজ করেন৷ বাস্তবে তাই সরাসরি বিমানের সঙ্গে কাজ করেন ১,৪০০ কর্মচারী৷''

তিনি বলেন, ‘‘বিমান আধা বাণিজ্যিক এবং আধা রাষ্ট্রের সেবামূলক প্রতিষ্ঠান৷ আমরা চাইলেই আন্তর্জাতিক দামের সঙ্গে মিলিয়ে টিকেটের দাম নির্ধারণ করতে পারি না৷ হজ্জযাত্রীদের অনেক কম খরচে পরিবহল করতে হয়৷ ভিভিআইপিদের সার্ভিস দিতে হয়৷ আমি বলবো, বিমান বিশ্বমানের নয়, তবে আমার ভালো করছি৷ বিমান এখন লাভের মুখ দেখতে শুরু করেছে৷''

বিমানের উন্নতি করতে উদ্যোগ

বিমানের জনসংযোগ ব্যবস্থাপক শাকিল মেরাজ ডয়চে ভেলেকে জানান, ‘‘আমরা বিমানের যাত্রীসেবা বাড়াতে নানা উদ্যোগ নিচ্ছি৷ এরমধ্যে অনলাইন টিকেটিং, বুকিং অন্যতম৷ উড়োজাহাজেও যাত্রীদের বিনোদনসহ তাদের সুযোগ-সুবিধা বাড়ানোর চেষ্টা চলছে৷''

তিনি আরো বলেন, ‘‘জ্বালানির দামের সঙ্গে তুলনা করলে আমাদের টিকেটের দাম কম৷ তারপরও আমরা গতছর ২৭২ কোটি টাকা লাভ করেছি৷ চলতি বছরেও লাভ হবে৷ আমরা আগের চেয়ে অনেক ভালো করছি৷''

বিমান সংশ্লিষ্ট এবং এভিয়েশন বিশেষজ্ঞরা বিমানের খারাপ অবস্থার জন্য প্রধাণত পাঁচটি কারণকে দায়ী করছেন:

১. দক্ষ জনশক্তির অভাব

২. পরিচালনায় এভিয়েশন খাত সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি কম

৩. রাজনৈতিক বিবেচনায় পরিকল্পনা নেওয়া হলেও ব্যবসায়িক বিবেচনায় সিদ্ধান্ত কম

৪. সরকারি প্রতিষ্ঠান হওয়ায় কর্মীদের কাজের প্রতি আন্তরিকতা কম

৫. কর্মীদের দুর্নীতি

বেশ কয়েকটি বেসরকারি এয়ারলাইন্সের নীতি নির্ধারণী পদে কাজ করেছেন এটিএম নজরুল৷ তার হাত দিয়ে চালু হয়েছে বাংলাদেশের অন্তত দু'টি বেসরকারি এয়ারলাইন্স৷ এই এভিয়েশন বিশেষজ্ঞ ডয়চে ভেলেকে বলেন, ‘‘বিমান শুরুতেই নিজেকে বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে ভাবতে পারেনি৷ এখানে যারা কাজ করেন, তারা ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে কাজ করেন, সেই মনোভাবের নয়৷ তারা সরকারি কাজ করেন৷ ফলে বিমান তার সেবার মান ও ব্যবসা কোনোটিই ঠিক রাখতে পারেনি৷ আর বিমান যখন যা-ই করেছে তার পিছনে ব্যবসামুখী কোনো পরিকল্পনা ছিল বলে আমার মনে হয় না৷ পুরনো বিমান, ভাড়া করা বিমান দিয়ে তারা ব্যবসা করতে গেছে৷ তা হয় না৷ বিমানের রক্ষণাবেক্ষণের নামে প্রচুর অর্থ চলে গেছে দেশের বাইরে৷''

অডিও শুনুন 12:01

‘‘বিমান শুরুতেই নিজেকে বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে ভাবতে পারেনি’’

তিনি বলেন, ‘‘এখানে অপারেটিং কস্ট-এর চেয়ে ভাড়া কম৷ অপ্রয়োজনীয় লোকের কারণে অপারেটিং কস্ট বেশি হয়৷ সব মিলিয়ে পেশাদারিত্ব নেই৷ পেশাদারিত্ব না থাকলে যাত্রীসেবার মানও খারাপ হয়৷ আর এই মান দিয়ে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে প্রতিযোগিতা করা সম্ভব নয়৷''

বিশ্লেষকরা বলছেন, ‘‘বিমান এখন পাবলিক লিমিটেড কোম্পানি হলেও বাস্তবে এর চরিত্রের তেমন কোনো পরিবর্তন হয়নি, কারণ, বোর্ড সদস্য আর চেয়ারম্যান নিয়োগ দেয় সরকার৷ বিমান গত বছর যে লাভের হিসাব দিয়েছে তার মধ্যে ফাঁকি আছে৷ কারণ আগের লোকসানের দায় বাদ দিয়ে লাভের হিসাব করা হয়৷ আর নতুন এয়ারক্রাফট কেনা হয়েছে সরকারের টাকায়৷ বিমান শুধু অপারেটিং কস্ট হিসাব করে লাভ দেখাচ্ছে, যা বাস্তবসম্মত নয়৷''

আপনার কি কিছু বলার আছে? লিখুন নীচের মন্তব্যের ঘরে৷

নির্বাচিত প্রতিবেদন

এই বিষয়ে অডিও এবং ভিডিও

সংশ্লিষ্ট বিষয়