1. Inhalt
  2. Navigation
  3. Weitere Inhalte
  4. Metanavigation
  5. Suche
  6. Choose from 30 Languages

আলাপ

‘আমার সোনার বাংলা’ কি জঙ্গিবাদের পথে?

বাংলাদেশে আইএস আছে কি নেই এ নিয়ে বিতর্ক এখন বাতুলতা মাত্র৷ জঙ্গিবাদ যে বড় সমস্যা, দেরিতে হলেও সরকার তা মানছে৷ বিশ্বের কাছে ক্রমশই বড় হয়ে উঠছে একটি প্রশ্ন – বাংলাদেশ কি জঙ্গিবাদের পথে?

জঙ্গি প্রসঙ্গে অবশেষে ‘অস্বীকারের কৌশল' থেকে সরে এসেছে সরকার৷ সাম্প্রতিক অতীতেও বহুবার সরকারসংশ্লিষ্টদের বলতে শোনা গেছে, ‘‘দেশে আইএস নেই৷'' গত মার্চে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও বলেছেন, ‘‘আমাদের গোয়েন্দারা খুব তৎপর৷ তারা জানিয়েছেন, দেশে কোনো আইএস নেই৷''

তখন বিদেশি হত্যা, সংখ্যালঘু হত্যার পেছনে বিএনপি-জামায়াতের হাত থাকতে পারে বলেও ইঙ্গিত দিয়েছিলেন শেখ হাসিনা৷

রমজান মাসে গুলশানের হোলি আর্টিজান রেস্টুরেন্টে জঙ্গি হামলার ঘটনায় ২৯ জন এবং ঈদের দিন শোলাকিয়ায় চার জন নিহত হওয়ার পর প্রধানমন্ত্রী নিজেই দেশে জঙ্গিবাদের বিস্তার, জঙ্গি ও সন্ত্রাস দমনে সরকারের বিভিন্ন পদক্ষেপ এবং প্রত্যাশিত আন্তর্জাতিক সহায়তা সম্পর্কে সারা বিশ্বকে জানানোর সিদ্ধান্ত নেন৷

এর ফলে সরকার ‘অস্বীকার' আর ‘ষড়যন্ত্র তত্ত্ব' ছেড়ে জঙ্গিবাদ নির্মূলে সর্বাত্মক প্রয়াসের দিকে মনোনিবেশ করবে বলে ধারণা করা হচ্ছে৷

অতীতে বিএনপি-জামায়াত সরকারও বাংলাদেশে ‘জঙ্গি নেই' বলে সত্য আড়াল করার চেষ্টা করেছে৷ জঙ্গি ‘বাংলা ভাই'-এর উত্থানের সময় সব খবরের সত্যতা অস্বীকার করতে গিয়ে বলা হয়েছে, ‘‘বাংলাদেশে কোনো জঙ্গি নেই৷ বাংলা ভাই মিডিয়ার সৃষ্টি৷'' পরে চাপের মুখে বাংলা ভাই এবং শায়খ আব্দুর রহমানকে গ্রেপ্তার করা হয়৷ ২০০৭ সালের ৩০ মার্চ শায়খ আবদুর রহমান ও সিদ্দিকুল ইসলাম বাংলা ভাইসহ ছয় শীর্ষ জঙ্গির ফাঁসি কার্যকর হয়৷ ফাঁসি কার্যকর হয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে৷

কিন্তু জঙ্গিদের ফাঁসি কার্যকর করার পর থেকে জঙ্গিতৎপরতা নির্মূল করার জন্য সমন্বিত এবং ধারাবাহিক প্রয়াস কখনোই দেখা যায়নি৷ প্রসঙ্গত, ফখরুদ্দিন আহমেদের নেতৃত্বাধীন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত ২০০৮-এর জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জয়ী হওয়ার পর থেকে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন জোটই ক্ষমতায় রয়েছে৷

বাংলাদেশে জঙ্গি তৎপরতার ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট রয়েছে৷ আফগানিস্তানে তালেবান সৃষ্টির ধারাবাহিকতায় উপমহাদেশের অন্যান্য দেশেও জঙ্গিবাদ মাথা চাড়া দিয়েছে৷ পাকিস্তান আর জঙ্গিবাদ এখন প্রায় সমার্থক৷ অসংখ্য জঙ্গি হামলা হয়েছে সে দেশে৷ ভারতেও মুম্বইসহ কয়েকটি জায়গায় বড় ধরনের হামলা চালিয়েছে জঙ্গিরা

ভারতের প্রতিবেশী বাংলাদেশে জঙ্গি হামলার শুরু গত শতকে৷ হামলা শুরুর আগে জঙ্গিরা দীর্ঘদিন সংগঠিত হওয়ার সুযোগও পেয়েছে৷ যুক্তরাষ্ট্রের ইলিনয় স্টেট ইউনিভার্সিটির রাজনীতি ও সরকার বিভাগের অধ্যাপক আলী রিয়াজ সেই সময়ের কথা তুলে ধরতে গিয়ে লিখেছেন, ‘‘ নিরাপত্তা বিশ্লেষক, দেশি-বিদেশি গোয়েন্দা সংস্থা, সন্ত্রাসবাদ বিষয়ের সাংবাদিক, নিরাপত্তা নীতিমালা তৈরির সঙ্গে যাঁরা যুক্ত, তাঁদের কাছে বাংলাদেশে জঙ্গিবাদের বিষয়টি প্রায় দুই দশকের পুরোনো৷ বাংলাদেশে জঙ্গিবাদের সূচনা নব্বইয়ের দশকের কথাই বলবেন৷ এটাও উল্লেখ করা দরকার যে বাংলাদেশে জঙ্গিবাদের সূচনার সঙ্গেই জড়িয়ে আছে বিদেশি সংশ্লিষ্টতা৷ এ দেশে জঙ্গিবাদের উৎসমুখ বলে যাকে চিহ্নিত করা যায়, সেই হরকাতুল জিহাদ আল ইসলামীর (হুজি) কার্যত প্রকাশ ঘটেছিল ১৯৯২ সালের ৩০ এপ্রিল ঢাকায়, জাতীয় প্রেসক্লাবে৷ আফগান মুজাহিদদের কাবুল বিজয়ে উল্লসিত ওই যুদ্ধে অংশগ্রহণকারী বাংলাদেশি ‘স্বেচ্ছাসেবী'দের একাংশ সংবাদ সম্মেলন করেছিল সেদিন৷ সাংগঠনিকভাবে হুজি সংগঠিত হচ্ছিল আরও কয়েক বছর আগ থেকে৷ পাকিস্তানে হুজির প্রাথমিক রূপ তৈরি হয় ১৯৮০ সালে, কিন্তু এর আনুষ্ঠানিক প্রতিষ্ঠা হয়েছিল ১৯৮৮ সালে এবং এর প্রসার ঘটে পরবর্তী চার বছরে৷ এই সময়েই সাংগঠনিকভাবে দক্ষিণ এশিয়ার অন্য দেশে বিস্তারের পরিকল্পনা করা হয় এবং তার অংশ হিসেবেই বাংলাদেশে হুজির যাত্রা শুরু৷''

বাংলাদেশে জঙ্গিবাদের সূচনা এবং বিস্তার নিয়ে অনেক তথ্যপূর্ণ লেখালিখি হয়েছে৷ কিন্তু তারপরও সরকার বা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর মধ্যে জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে তেমন কোনো সতর্কতামূলক ব্যবস্থা বা প্রতিরোধের উদ্যোগ দেখা যায়নি৷

২০০৩ সাল থেকে বিভিন্ন ঘটনা পরম্পরায় বাংলাদেশে বেশ কিছু উগ্রবাদী দলকে নিষিদ্ধ ঘোষণা এবং কালো তালিকাভুক্ত করা হয়েছে৷ কিন্তু এর বাইরে দৃশ্যত জঙ্গি তৎপরতাবিরোধী ধারাবাহিক কোনো পদক্ষেপ নেয়া হয়নি৷ পরিণামে জঙ্গি তৎপরতা বেড়েছে৷ একসময় মনে করা হতো, জঙ্গি তৎপরতা শুধু মাদ্রাসাকেন্দ্রিক৷

কিন্তু ধীরে ধীরে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়, ইংরেজি মাধ্যম স্কুল, এমনকি দু-একটি বহুজাতিক কোম্পানিও চলে আসে সন্দেহের আওতায়৷ সন্দেহের ভিত ক্রমশ মজবুত হয়েছে নানা সময়ে জঙ্গিবাদী অপতৎপরতায় জড়িত সন্দেহে কিছু মানুষ গ্রেপ্তার হওয়ায়৷ সুনির্দিষ্ট অভিযোগ এবং প্রমাণও ছিল তাদের অনেকের বিরুদ্ধে৷

গুলশান হামলার পর থেকে নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ে রীতিমতো তোলপাড় শুরু হয়েছে৷ বেসরকারি এ বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে যাওয়া ‘অভিজাত' পরিবারের সন্তানরা কীভাবে জঙ্গি তৎপরতায় জড়িয়ে পড়ছে এ নিয়ে সবাই চিন্তিত৷ অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, বিশ্ববিদ্যালয়টিতে এক সময় দুই যুদ্ধাপরাধীর সন্তানও শিক্ষকতা করেছেন৷

এসব কারণে নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ে যখন তুমুল মাতামাতি, তখনই বেরিয়ে এসেছে আরো ভয়াবহ তথ্য৷ দেখা যাচ্ছে, দেশের অনেক বিশ্ববিদ্যালয়েই এখন জঙ্গিরা তৎপর৷ গণমাধ্যমে প্রকাশিত খবর অনুযায়ী, এখন পর্যন্ত দেশের ৯টি বিশ্ববিদ্যালয়ের ৩৩ জনকে জঙ্গি তৎপরতায় সম্পৃক্ত থাকায় অভিযুক্ত করা হয়েছে৷ ৩৩ জনের মধ্যে ১১ জন নর্থ-সাউথের, ৬ জন বুয়েটের, ৬ জন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের, ৩ জন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের, ৩ জন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের এবং ২ জন ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের৷

জঙ্গিবাদ যে সব ধরনের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শুধু ঢুকেছে তা-ই নয়, সাম্প্রতিক সময়ে জঙ্গিবাদের থাবা নারীদের একটা অংশকেও স্পর্শ করেছে

বাংলাদেশের জঙ্গিরা দেশের বাইরেও তৎপর৷ সিঙ্গাপুরে বাংলাদেশি জঙ্গি আটকের খবর ইতিমধ্যে সারা বিশ্বে সাড়া জাগিয়েছে৷ আটক ব্যক্তিরা জানিয়েছে, বাংলাদেশে তারা খেলাফত কায়েম করতে চায়, সেই উদ্দেশ্য হাসিলের জন্যই তারা সিঙ্গাপুরে সক্রিয় ছিল৷ জঙ্গি অর্থায়নের অভিযোগে ৪ বাংলাদেশিকে ইতিমধ্যে দোষী সাব্যস্ত করেছে সিঙ্গাপুরের আদালত

আরো কয়েকটি দেশে বাংলাদেশি জঙ্গিদের তৎপরতার খবর পাওয়া গেছে৷ দেশি-বিদেশি সব সংবাদ মাধ্যমেই এসব খবর প্রকাশিত হয়েছে৷

অন্য দেশে হামলা চালানোর পর জঙ্গিরা বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়- আন্তর্জাতিক সংবাদ মাধ্যমে এমন খবরও এসেছে৷ বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত ব্রিটিশ নাগরিক সিরিয়ায় আইএস-এর জন্য ‘জিহাদি' সংগ্রহে বাংলাদেশে এসেছে বলে খবর পাওয়া গেছে৷ খবরে প্রকাশ, এ কাজে তাদের সহায়তা করেছে কাগজে-কলমে নিষিদ্ধ সংগঠন জেএমবি৷

সব মিলিয়ে দেশে-বিদেশে বাংলাদেশি জঙ্গিদের তৎপরতা আন্তর্জাতিক মহলে অজানা নেই৷ তাই আফগানিস্তান আর পাকিস্তানের পর দক্ষিণ এশিয়ার আরেক দেশ বাংলাদেশেও কীভাবে জঙ্গিবাদ আস্তানা গাড়তে শুরু করেছে এ নিয়ে নিয়মিতই বিশ্লেষণাত্মক লেখালেখি হচ্ছে৷

ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল সম্প্রতি আইএস বা আইএস সমর্থিত জঙ্গিরা কেন বাংলাদেশে তৎপর হচ্ছে এর কারণ অনুসন্ধানের চেষ্টা করেছে৷ তাদের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, তথাকথিত জঙ্গি সংগঠনটি এখন কৌশলগত কারণেই বাংলাদেশে সক্রিয়তা বাড়াচ্ছে৷

আশার কথা, বাংলাদেশ সরকার দেরিতে হলেও বিষয়টিকে অবশেষে গুরুত্ব দিতে শুরু করেছে৷ তাই প্রধানমন্ত্রীও সম্ভাব্য হামলার বিষয়ে সবাইকে সতর্ক করেছেন

মসজিদে খুতবায় জঙ্গিবাদ যে ইসলামের শত্রু তা স্পষ্ট করে বলার উদ্যোগ নিয়েছে ইসলামিক ফাউন্ডেশন৷

বিশ্লেষকরা মনে করেন, বাংলাদেশকে জঙ্গিবাদের হাত থেকে বাঁচাতে সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা এবং তার যথার্থ বাস্তবায়ন দরকার৷ ডয়চে ভেলেকে দেয়া সাক্ষাৎকারে নিরাপত্তা বিশ্লেষক মেজর জেনারেল (অব.) আব্দুর রশীদ জঙ্গি নির্মূলে বিশেষ বাহিনী গঠনের ওপর জোর দিয়েছেন৷ তাঁর মতে, ‘‘ জঙ্গি হামলার ঝুঁকি মোকাবিলা করার জন্য দেশব্যাপী অ্যাসাইন্ড ফোর্স থাকা উচিৎ৷ যুক্তরাষ্ট্রের হোমল্যান্ড সিকিউরিটির মতো, যাদের দায়িত্বই থাকবে জননিরাপত্তা এবং জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করা৷ তারা সর্বক্ষণ এটা নিয়েই কাজ করবেন৷''

অডিও শুনুন 05:59

‘সন্তান কোথায় যাচ্ছে, কী করছে সেদিকে নজর থাকতে হবে’

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাধ বিজ্ঞান বিভাগের চেয়ারম্যান ড. জিয়া রহমান জোর দিয়েছেন প্রাতিষ্ঠানিক ও সামাজিক শিক্ষার ওপর৷ তাছাড়া সমাজে পরিবারের সনাতনী ভূমিকা ফিরিয়ে আনার ওপরও জোর দিয়েছেন তিনি৷ ডয়চে ভেলের ঢাকা প্রতিনিধি হারুনুর রশীদ স্বপনকে তিনি বলেছেন, ‘‘দেশের শিক্ষাব্যবস্থা বিভিন্নভাবে ভাগ হয়ে আছে৷ আমার মনে হয় সর্বস্তরে একরৈখিক শিক্ষা খুবই জরুরি৷ তাছাড়া নগরায়ন বা তথাকথিত আধুনিকায়নের কারণে পরিবারের সনাতনী ভূমিকাও পাল্টে গেছে৷ এ অবস্থায় সন্তান কোথায় যাচ্ছে, কী করছে সেদিকে নজর রাখার জন্য পিতা-মাতাকে আরো সজাগ থাকতে হবে৷ ফেসবুক, টুইটারের মতো সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমের ওপর এক ধরণের রেগুলেশন থাকাও জরুরি৷ বিশেষ করে যুদ্ধাপরাধীদের ইস্যুসহ আরো কিছু বিষয়ে যেভাবে টাকা খরচ করে তৎপরতা চালানো হচ্ছে, এগুলো বন্ধ করার জন্য এটা খুব জরুরি৷''

গুলশান ট্র্যাজেডির পর থেকে বাংলাদেশকে অনেকটা আতশ কাচের নীচেই রেখেছে আন্তর্জাতিক সংবাদ মাধ্যম৷ কোনো কোনো প্রতিবেদনে থাকছে একাত্তরে ধর্মান্ধতা এবং সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে জয় ছিনিয়ে আত্মপ্রকাশ করা দেশটির ভবিষ্যত নিয়ে চরম আশঙ্কার কথা৷ ‘সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে হেরে যাচ্ছে বাংলাদেশ'- এমন শিরোনামও হয়েছে৷

সরকারের সাম্প্রতিক কিছু উদ্যোগে অবশ্য ভিন্ন ইঙ্গিত৷ সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে লড়াইটা যেন সবে শুরু করেছে বাংলাদেশ৷

আপনার কি কিছু বলার আছে? লিখুন নীচের মন্তব্যের ঘরে৷

নির্বাচিত প্রতিবেদন

এই বিষয়ে অডিও এবং ভিডিও

সংশ্লিষ্ট বিষয়