1. Inhalt
  2. Navigation
  3. Weitere Inhalte
  4. Metanavigation
  5. Suche
  6. Choose from 30 Languages

বিশ্ব

আমার দেখা সামাজিক কোরবানি

ঈদ-উল-আযহার আদর্শ সমাজে আনতে পারে অনন্য সম্প্রীতি৷ আর এর অন্তনির্হিত আদর্শ যদি ছড়িয়ে দেয়া যায় তাহলে সমাজে থাকবে না কোনো ভেদাভেদ, মনে করেন ডয়চে ভেলের ঢাকা প্রতিনিধি হারুন উর রশীদ স্বপন৷

১৯৯০ সালের কথা৷ আমি সবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েছি৷ থাকতাম জহিরুল হক হলে৷ অর্থনীতি বিভাগে পড়ার সময় আমাদের কয়েকজন সহপাঠী ছিলেন পুরনো ঢাকার৷ ঠিক মনে নেই, একবার কোরবানির ঈদে কী কারণে যেন গ্রামের বাড়ি যাইনি, হলেই ছিলাম৷ আর হলে থাকব এই খবর পেয়ে আমাদের সহপাঠী পুরনো ঢাকার আবিদ আগেই দাওয়াত দিয়ে রেখেছিল৷ আমি সকালেই বের হই৷ ঈদের নামাজ পড়ি পুরনো ঢাকায় আবিদের সঙ্গেই৷ তারপর কোরবানি দেখার পালা৷ আর সেই কোরবানি আমার চোখ খুলে দেয়৷ আমাকে কোরবানি সম্পর্কে নতুন করে ভাবতে শেখায়৷

Eid ul-adha Islamisches Opferfest in Bangladesch 2013

পুরনো ঢাকায় কোরবানির মাংস তৈরির পর পাড়ার লোকের সবার তালিকা ধরে মাংস ভাগ করা হয়

সামাজিক কোরবানি

পুরনো ঢাকার রেওয়াজ অনুযায়ী আবিদদের পাড়ার যারা কোরবানির পশু কিনেছেন তারা সব এক জায়গায় নিয়ে এলেন, গরু-ছাগল সব৷ এরপর একসঙ্গে কোরবানি দেয়া হলো৷ কোরবানির মাংস তৈরির পর পাড়ার লোকের সবার তালিকা ধরে মাংস ভাগ করা হল৷ যারা কোরবানির পশু কিনতে পারেননি তাদের জন্যও৷ সবাইকে মাংস দেয়া হল৷ কেউ বাদ পড়লেন না৷ আমি বিস্মিত হলাম, অভিভূত হলাম – এই সাম্য দেখে৷ পরে আবিদ আমাকে জানায় একে বলা হয় সামাজে কোরবানি৷

পরে পেশা হিসেবে সাংবাদিকতা বেছে নেয়ার পর এই সামাজিক কোরবানির খবর সংগ্রহ করতেও পুরনো ঢাকায় গিয়েছি৷ খবর তৈরি করেছি৷ প্রচার করেছি৷ তবে সামাজিক কোরবানির এই রেওয়াজ দিন দিন কমে আসছে৷ যা আমাকে কষ্ট দেয়৷

শৈশবে আমাদের বরিশালের গ্রামের বাড়িতেও দেখেছি একই ধরনের কোরবানি৷ এক বাড়ির যত গেরস্থ তারা সবাই একসঙ্গে কোরবানি দিতেন৷ তারপর যারা দিতে পারতেন না তাদের ভাগ করে মাংস দেয়া হতো৷ প্রতিবেশীরাও বাদ যেতেন না৷ আর খাওয়ার সময় বাড়ির সবাই চাদর পেতে একসঙ্গে বসতেন৷ সবার রান্না করা মাংস এক জায়গায় এনে তারপর সবাই মিলে খেতেন৷ সেই রেওয়াজও এখন আর নেই৷

কোরবানির ইতিহাস ত্যাগ ও মহিমার৷ ইসলাম ধর্মের অনুসারীরা বিশ্বাস করেন, হযরত ইব্রাহিম (আ.) আল্লাহর নির্দেশে তাঁর শিশুপুত্র ইসমাইলকে কোরবানি দিতে উদ্যত হয়েছিলেন৷ আল্লাহ তাঁর কোরবানি কবুল করে নেন৷ ইসমাইলের পরিবর্তে কোরবানি হয়ে যায় পশু৷ আর এই পশু কোরবানি একটি উপলক্ষ্য৷ এর মাধ্যমে মনের পশুকে কোরবানি দিতেই বলা হয়েছে৷ মনের সব পাপ, অসততা, জরা কোরবানিই হল আসল কোরবানি৷

Eid ul-adha Islamisches Opferfest in Bangladesch 2013

আলোর নীচে যেমন অন্ধকার, তেমনি স্বাস্থ্যবান এই পশুর দিকে তাকিয়ে থাকে লিকলিকে মানব সন্তান (প্রতীকী ছবি)

নিয়ম মেনে কি কোরবানি হচ্ছে?

ঢাকার পশুর হাটে গরু কেনার প্রতিযোগিতা৷ বাহারি গরু কিনতে বিত্তবানরা অকাতরে টাকা ঢালছেন৷ আর সেই গরু হাট থেকে বাসায় নিয়ে এসে আয়োজন করা হয় প্রদর্শনীর৷ কে কত বড় গরু কিনেছেন৷ কার গরুর কত দাম তা নিয়েই চলে আলোচনা৷

আলোর নীচে যেমন অন্ধকার, তেমনি স্বাস্থ্যবান এই পশুর দিকে তাকিয়ে থাকে লিকলিকে মানব সন্তান৷ তার চেয়ে দেখাই সার৷ মাংস তার কপালে জুটবে কী না তা নিশ্চিত নয়৷ কারণ পশু কোরবানির যে নিয়ম তা অনেকেই ভুলতে বসেছেন৷ তিনভাগ মাংসের দু'ভাগ গরীব আর আত্মীয় স্বজনের পাওয়ার কথা থাকলেও তা তেমন আর হয় না৷ তাই যদি হত তাহলে কোরবানির আগে ঢাকায় বিশাল আকারের ডিপ ফ্রিজের বিক্রি এত বেড়ে যেতো না৷ গরিবের হক, প্রতিবেশীর হক হয়তো জমা হবে ডিপফ্রিজে৷

অর্থনীতির ছাত্র আমি৷ সাংবাদিক আমি৷ আমি আমার একাধিক প্রতিবেদনে দেখিয়েছি ঈদ উত্‍সবে সামাজিক বৈষম্য দেখা যায় বেশি৷ প্রকট আকারে ধরা পড়ে৷ ঈদ-উল-ফিতর বা ঈদ-উল-আযহা যেটাই হোক না কেন৷ কারণ বাংলাদেশে মুসলমানদের এই দু'টি মহান ধর্মীয় উত্‍সবকে কেন্দ্র করে একশ্রেণির মানুষ তাদের সম্পদ দেখানোর মওকা পেয়েছেন৷ তারা মহান আদর্শের ধারে কাছে নেই৷ ঈদের জামায়াতে এককাতারে নামাজ পরে, ঈদের সুমহান আদর্শের বয়ান শুনে ঈদগাঁ থেকে বের হয়েই তা ভুলে যান৷

DW-Korrespondent in Bangladesch, Harun Ur Rashid Swapan

ব্লগটি লিখেছেন হারুন উর রশীদ স্বপন

জাকাত নাকি বদান্যতা

জাকাত দেয়ার নামে নিরন্ন মানুষকে দীর্ঘ লাইনে দাঁড়া করিয়ে একটি শাড়ি বা লুঙ্গি তুলে দেন৷ আর এই বদান্যতার উলঙ্গ প্রকাশের শিকার হয়ে প্রতিবছরই ভিড়ের চাপে পদদলিত হয়ে মারা যান কেউ না কেউ৷ গত ঈদ-উল-ফিতরেও বরিশালে মারা গেছেন তিনজন৷ আর কোরবানির ঈদে একদল আছেন লাইনে লোক দাঁড়া করিয়ে মাংস বিলি করেন৷ লম্বা লাইন হয়৷ ক্ষুধার্ত মানুষের সানকিতে দেয়া হয় এক কী দুই টুকরা মাংস৷ কিন্তু আমি হলফ করে বলতে পারি বাংলাদেশে ঈদ-উল-আযহায় যত পশু কোরবানি হয় তা যদি ইসলামের রীতি অনুযায়ী বিলি বণ্টন করা হয় তাহলে ষোল কোটি মানুষ সবাই অন্তত একবেলা তৃপ্তির সঙ্গে খেতে পারেন৷ অথবা পুরনো ঢাকার মত যদি সমাজে কোরবানি হয় তাহলে কাউকে লাইনে দাড়িয়ে মাংস নিতে হবে না৷ কিন্তু বাস্তবে তা হয় না৷

আর কোরবানির মূল আদর্শের কথাতো বাদই দিলাম৷ আমরা যদি সেই ত্যাগের আদর্শে উজ্জীবিত হতে পারতাম তাহলে সমাজে হিংসা, হানাহানি থাকতো না৷ বেশি লাভের আশায় কৃত্রিমভাবে কোরবানির গরুকে ওষুধ খাইয়ে মোটা-তাজা করে প্রতারণা করতেন না ব্যবসায়ীরা৷ অজ্ঞান পার্টির খপ্পরে পড়ে কাউকে জীবন দিতে হতো না৷ কোরবানির পশুর চামড়া নিয়ে হতো না বন্দুক যুদ্ধ৷ আর কালো টাকার প্রতিযোগিতায় সাম্যের উত্‍সব অসাম্যের প্রকাশ ঘটতো না৷

তবুও আশায় বুকবাধি প্রকৃত কোরবানির আদর্শে একদিন উজ্জীবিত হবেন আমার দেশের মুসলমানরা৷ সাম্য আর ভ্রাতৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হবে ঈদের আদর্শে৷

নির্বাচিত প্রতিবেদন

সংশ্লিষ্ট বিষয়