1. Inhalt
  2. Navigation
  3. Weitere Inhalte
  4. Metanavigation
  5. Suche
  6. Choose from 30 Languages

বিশ্ব

আমাদের রাজনীতি ও কিছু মানিপ্ল্যান্ট

‘সব পুড়ছে, ব্রহ্মা পুড়ছে, আমি পুড়ছি...'– কিংবদন্তি চলচ্চিত্রনির্মাতা ঋত্বিক ঘটকের ‘যুক্তি তক্কো গপ্পো'-তে যখন এই সংলাপটা শুনি, তখন নিজের অজান্তেই মনের মধ্যে জাগে সেই অতি পুরাতন দার্শনিক সত্যটি ‘আমি কে?'৷

মাঝে মাঝে এমনও মনে হয়, এই ‘আমি'র অর্থ কি সবখানে এক? সব প্রেক্ষিতে কি একইভাবে পুড়ে যায় এই ‘আমি'? সক্রেটিস যখন বলেন ‘নিজেকে জানো', তখন কি রাষ্ট্র একবার আয়নায় নিজের চেহারাটা দেখে? না, রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ধারণায় যাঁরা রাষ্ট্রের সংজ্ঞা নিয়ে ভাবেন, তাঁদের সঙ্গে আমার ভাবনাটা মিলবে না৷ আমি নেহাতই সাধারণ মানুষ, রাষ্ট্র বলতে আমি বুঝি সকল নাগরিকের জন্য এমন একটি নিরাপদ আবাসস্থল, যেখানে রক্ষিত হবে সকল নাগরিকের মৌলিক অধিকারসহ সংবিধান স্বীকৃত অন্যান্য সকল অধিকারসমূহ৷ আমি বুঝি, রাষ্ট্র এমন একটি ধারণা, যার কোনো ধর্ম-বর্ণ-শ্রেণি থাকতে পারে না, থাকতে পারে না কোনো বৈষম্যতাড়িত ব্যবস্থা৷ রাষ্ট্রের কোনো ধর্ম থাকতে পারে না, রাষ্ট্রের থাকবে সংবিধান, যা হতে হবে অবশ্যই ধর্মনিরপেক্ষ ও কল্যাণকামী- এক কথায়, মানবতাবাদ-কেন্দ্রিক৷

Imran H Sarker Blogger aus Bangladesch

ব্লগটি লিখেছেন ইমরান এইচ সরকার

রাষ্ট্র-কাঠামোর ভাবনায় আমি যখন বাংলাদেশের কথা ভাবি, তখন আমার মনে এই সত্যটিই বারবার মূর্ত হয় যে, বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রের সবকিছুর পূর্ণ সংজ্ঞায়নের সূচনা ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ৷ মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়েই নির্ধারিত হয়েছে আমাদের সার্বিক পরিস্থিতি; আমাদের শাসনব্যবস্থা- গণতন্ত্র, আমাদের অর্থনৈতিক ব্যবস্থা- সমাজতন্ত্র, আমাদের নৃতাত্ত্বিক বৈষম্যহীনতা- ধর্মনিরপেক্ষতা এবং আমাদের জাতিগত পরিচয়- বাঙালি জাতীয়তাবাদ৷ কিন্তু স্বাধীনতার তেতাল্লিশ বছর পর যদি আমরা রাষ্ট্রের ‘আমি'র দিকে তাকিয়ে দেখতে চাই, মুক্তিযুদ্ধের অব্যবহিত পরবর্তী বাংলাদেশটি কেমন ছিলো, তাহলে নির্দ্বিধায় হতাশাগ্রস্থ হতে হয়৷ ‘হতাশা কেনো?'- এই প্রশ্নটি যদি আমাকে কেউ করেন, তাহলে উত্তর হলো- বিদ্যমান পরিস্থিতির জন্য আমি হতাশ নই, কারণ আমি জানি দুঃসময় থেকে সুসময়ে মানুষই মানুষকে টেনে নিয়ে যায়, এবং সে সময় আমরা পার করে এসেছি বহু আগে৷ মানুষের উপর প্রগাঢ় বিশ্বাস থেকে আমরা যে কোনো অমানিশা কাটিয়ে উঠতে পারবো- এ শিক্ষা আমরা পেয়েছি আমাদের ইতিহাসের পৃষ্ঠা থেকে৷ কিন্তু হতাশ হচ্ছি তখনই, যখন বারবার হোঁচট খাচ্ছে আমাদের বুকের গহীনে লালিত বিশ্বাস৷ আমরা মুষড়ে পড়ছি, যখন দেখছি আমাদের আস্থার ভিত আস্থাহীনতার ভারে ক্রমশ ভেঙে যাচ্ছে, গুড়িয়ে যাচ্ছে৷ একটি উদাহরণ সামনে রেখে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করা যাক৷ ১১ অক্টোবর, শনিবারের একটি ঘটনা৷ লালমনিরহাটের কালিগঞ্জ উপজেলার চন্দ্রপুর ইউনিয়নের নওদাবাস গ্রামের একটি ঘটনা৷

Sheikh Hasina

‘হামলাকারীরা প্রত্যেকেই ক্ষমতাসীন মহাজোট সরকারের নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মী’

মাছ ধরাকে কেন্দ্র করে এক হিন্দুধর্মাবলম্বী কৃষকের বাড়িতে হামলা চালিয়ে ধারালো অস্ত্র দিয়ে হত্যা করা হয় ভোলানাথ নামের এক কৃষককে৷ সতি নদীতে মাছ ধরাকে কেন্দ্র করে এ ঘটনা ঘটে৷ তারপর সেই কৃষকের বাড়িতে লুটপাট করা হয়, চালানো হয় ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ৷ গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদ থেকে জানা যায়, হামলাকারীরা প্রত্যেকেই ক্ষমতাসীন মহাজোট সরকারের নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মী৷ এটি কেবলই প্রতিবেদকের ভাষ্য নয়, কালিগঞ্জ উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক বিজয় কুমার রায় এ সত্যতা নিশ্চিত করেছেন তাঁর ভাষ্যে৷ কালিগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা সোহরাব হোসেনের বরাতে জানা যায়- ঘটনার পরদিন, অর্থাৎ রবিবার, ১২ অক্টোবর, হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত ছয়জনকে গ্রেফতার করা হয়৷

পাঠক এবার আপনাকে একটু সময় দিতে চাই৷ ‘আওয়ামী লীগের মতো একটি বড় দলে দু চারটে সন্ত্রাসী থাকবেই'- এই ধরণের সাফাই স্বগতোক্তি করার আগে আমি আপনাকে একটু সময় দিতে চাই, দ্বিতীয়বার ভাববার জন্য৷ বাংলাদেশের প্রধান দুইটি রাজনৈতিক দল- আওয়ামী লীগ ও বিএনপি (যদিও বিএনপি দলটিকে কতোটুকু রাজনৈতিক দল বলা যায়, তা নিয়ে আমার ব্যাপক সন্দেহ আছে৷ তারপরও যেহেতু অন্যান্য রাজনৈতিক দলগুলো নিজেদের অবস্থান পরিষ্কার করে বাংলাদেশের রাজনৈতিক মাঠে আসতে পারছে না, তাই বিএনপির মতো একটি দলকেও রাজনৈতিক দল হিসেবে স্বীকৃতি দিতে হচ্ছে) নির্দিষ্ট কিছু বিষয়ের উপর ভিত্তি করে তাদের রাজনীতি পরিচালনা করে৷ ভোটের রাজনীতির এটি একটি বড় সুবিধা৷ আমরা দেখেছি ২০০১ সালের পর বিএনপি ক্ষমতায় এসে কীভাবে মানবতাকে ভূ-লুণ্ঠিত করেছে, কীভাবে নানাস্থানে ভিন্ন ধর্মাবলম্বীদের উপর নির্যাতন করেছে এবং রাজাকারদের গাড়িতে পতাকা তুলে দিয়েছে৷

Bangladesh BNP Begum Khaleda Zia

‘বিএনপি দলটিকে কতোটুকু রাজনৈতিক দল বলা যায়, তা নিয়ে ব্যাপক সন্দেহ আছে’

এর বিরুদ্ধে আওয়ামী লীগ তখন সোচ্চার হয়েছে, রাস্তায় নেমে আন্দোলন করেছে৷ হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের নিরাপত্তার কথা বলেছে এবং এটা তো প্রচলিতই যে, হিন্দু ধর্মাবলম্বীরা বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের ভোটব্যাংক হিসেবেই কাজ করেছে৷ অর্থাৎ দেশের উন্নয়ন, আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থার উন্নয়ন কিংবা স্বাস্থ্যখাতের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো নয়, বরং ‘ধর্ম'- কে অবলম্বন করেই দুটো বৃহৎ রাজনৈতিক দল তাদের ভোটের রাজনীতি চালিয়ে আসছে৷ বিএনপি-রাজাকার জোট আমলে যখন যুদ্ধাপরাধীদের আস্ফালন বাড়তে থাকে, জনগণের মধ্যে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার, জঙ্গিবাদের নির্মূল ইত্যাদি বিষয়গুলো গুরুত্বের সঙ্গে আসতে থাকে, তখন আওয়ামী লীগ নির্বাচনি ইশতাহারে ‘যুদ্ধাপরাধীদের বিচার'- এর প্রসঙ্গটি আনে৷ এই কাজ তারা শুরুও করে, এবং এখনও তা চলছে, সুতরাং কথা রাখার জন্য আওয়ামী লীগ বরাবরের মতোই ধন্যবাদ প্রাপ্য, যেহেতু ‘কেউ কথা রাখে না'র এই সময়ে তারা কথাটুকু রেখেছেন৷ তবে এ কথা রাখাটা যে, মাঝে মাঝেই সেই লাঠি লজেন্সের মতোই, তা তো কাদের মোল্লার রায়ের পর থেকে সাঈদীর রায় পর্যন্ত আমরা দেখেছি এবং এটাও জানি যে, এখনও অনেক দেখার বাকি৷ সুতরাং ‘সংখ্যালঘু নির্যাতন' (এর চেয়ে জঘন্য শব্দ সম্ভবত হতে পারে না, যেহেতু আমার রাষ্ট্রে সব নাগরিক সমান হবার কথা ছিলো, সংখ্যালঘু, সংখ্যাগুরু বলে কিছু থাকার কথা নয়) আওয়ামী লীগের সময়ও আসলে বন্ধ হয়নি, বরং খোদ আওয়ামী লীগের নেতারাই এই নির্যাতন, এমনকি হত্যাকাণ্ড পর্যন্ত চালাচ্ছে৷ তাহলে দাঁড়াচ্ছে কী? দেশের মুসলমান ভোটাররা বাদে অন্য ধর্মাবলম্বী ভোটারগণ ভোট দিয়ে আওয়ামী লীগকে ক্ষমতায় এনে এখন দেখছেন, তারা আসলে খাল কেটে কুমির আনছেন৷ আবার কুমিরের হাত থেকে পালাবেন, তো মস্ত হিংস্র এক অজগরের হাতে পড়বেন৷ এই হলো আমাদের নিয়তি৷ একদিকে কুমির, একদিকে অজগর- মাঝখানে ভোলানাথের লাশ৷ রাষ্ট্র, তুমি কী পুড়ছো?

এরপরও একটি কথা থাকে৷ একটি সভ্য রাষ্ট্রে আইন আছে, আদালত আছে৷ আদালতের বিধি বিধান না মানলে আদালত অবমাননা আছে৷ সুতরাং বর্তমান সরকারের সমর্থকরা আমাকে এক হাত দেখে নিয়ে বলতেই পারেন, অপরাধীদের কোনো দল নেই, তাদের শাস্তি হবেই৷

এই বস্তাপচা রাজনৈতিক বক্তব্য যে বা যাঁরা দেবেন বলে ঠিক করে রেখেছেন, তাঁদের উদ্দেশে বলছি- কিছু কিছু বিষয় একসময় ঘরের শিঁকেতে তোলা ছিলো, আজকাল বোধ হচ্ছে- সেগুলো গাছের মগডালে উঠে গেছে৷ উল্লিখিত ঘটনায় ২১ অক্টোবরের একটি ফলো-আপ সংবাদ দেখা যাক৷ কালিগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা যেখানে শেষ করেছিলেন, সেখান থেকেই শুরু হচ্ছে৷ ভোলানাথ হত্যাকাণ্ডের প্রধান আসামি স্থানীয় ওয়ার্ড আওয়ামী লীগ নেতা রেজাউল করিম রেজা জামিনে মুক্তি পেয়েছে৷ সঙ্গে আছে বাকি পাঁচজন৷ পুলিশ বলছে, আদালতের সিদ্ধান্তে কিছু বলার নেই৷

তাহলে কে বলবে? হত্যাকাণ্ডের আসামিরা এখন ভোলানাথের ছেলে সুভাসচন্দ্র রায়কে হত্যার হুমকি দিয়ে বেড়াচ্ছে৷ আইনের নাকের ডগা দিয়ে চষে বেড়াচ্ছে হত্যাকাণ্ডের আসামিরা৷ এর কারণ কী? কারণ একটাই, এরা ‘রুলিং পার্টির নেতা'৷ এদের তো সাত খুন মাফ হবার কথা৷ সবে তো একটি খুন করেছে এরা৷ তাহলে প্রশ্ন, এই পুলিশ, এই আদালত, এই ভোটের রাজনীতি, এই স্থানীয় সরকার প্রশাসন- এগুলো কীসের জন্য? এগুলো কাদের হাতে? সবই কী তবে ভেলকিবাজীর খেলা? রাজনীতির জন্য, ভোট পাবার জন্য, ক্ষমতায় টিকে থাকার জন্য কিংবা ক্ষমতায় যাবার জন্য দুটো ‘ভালো কথা' বলা, একটু চটকদারি সেক্যুলার বিজ্ঞাপন দেখানো? এতো সব জোচ্চুরির মধ্যে ‘মানুষ' তাহলে কোথায়? ‘দেশপ্রেম' কোথায়? কোথায় রাজনীতিবিদদের সর্বোচ্চ উচ্চারিত শব্দদ্বয়- ‘মুক্তিযুদ্ধের চেতনা'?

এসব নিয়ে লিখতে গেলে মাথার মধ্যে কেবলই ঘুরপাক খায় সেই বাক্যটি- তোমারে বধিবে যে, গোকুলে বাড়িছে সে৷ এটা শোনার পরও যারা ভাবছেন- ‘ভোলানাথকে ভুলে যাওয়াই শ্রেয়, এসব কিছু নয়, চারিদিকে শান্তি.. ..' তাদের উদ্দেশে বাটলার ইয়েটসের পঙক্তিটি স্মরণ করিয়ে দিচ্ছি- All Changed, changed utterly: A terrible beauty is born.

নির্বাচিত প্রতিবেদন

সংশ্লিষ্ট বিষয়