1. Inhalt
  2. Navigation
  3. Weitere Inhalte
  4. Metanavigation
  5. Suche
  6. Choose from 30 Languages

বাংলাদেশ

‘আমাদের টার্গেট দক্ষ আলেম তৈরি, ডাক্তার-ইঞ্জিনিয়ার নয়’

বাংলাদেশে মাদ্রাসা শিক্ষা ব্যবস্থার দু’টি প্রধান ধারা – আলিয়া এবং কওমি৷ এছাড়া হাফেজিয়া, ফোরাকানিয়া ও ইবতেদায়ী মাদ্রাসা আছে৷ আলিয়া মাদ্রাসা সরকার স্বীকৃত৷ আর কওমি মাদ্রাসাকেও স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে সম্প্রতি৷

এই সময়ে আলোচনার তুঙ্গে রয়েছে কওমি মাদ্রাসা৷ কওমি মাদ্রাসার শিক্ষা ব্যবস্থাকে সরকার স্বীকৃতি দেওয়ার পাশাপাশি দাওরায়ে হাদিসকে সাধারণ শিক্ষার মাস্টার্স-এর সমমান ঘোষণা করা হয়েছে৷ যদিও অন্যান্য স্তরের মান কী হবে, তা এখনো নির্ধারণ করা হয়নি৷ এছাড়া আর দাওরায়ে হাদিস-এর মান নির্ধারণ নিয়েও জটিলতা আছে৷ কারণ কওমি শিক্ষার মধ্যে নানা ভাগ থাকায়, কেউ ন'বছর পড়াশুনার পর আবার কেউ ১২ বছর পড়াশুনার পর দাওরায়ে হাদিস পাশ করেন৷

১৮৬৬ সালে ভারতের উত্তর প্রদেশে দারুল উলুম দেওবন্দ মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে এই উপমহাদেশে কওমি মাদ্রাসা শিক্ষা ব্যবস্থার শুরু৷

এই শিক্ষা ব্যবস্থা মূলত ইংরেজদের প্রতিষ্ঠিত আলীয়া মাদ্রাসাকে চ্যালেঞ্জ করে গড়ে ওঠে, তাও আবার কোনো প্রকার সরকারি সহযোগিতা ছাড়াই৷ আর এখন তারা সরকারের স্বীকৃতি নিলেও, কোনো ধরনের আর্থিক সহযোগিতা নিতে রাজি নয়৷

অডিও শুনুন 04:37

‘কওমি শিক্ষা ব্যবস্থার ওপর সরকারের কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই’

কওমি মাদ্রাসাকে সরকারের মনিটরিং বা নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টা ছিল অনেক আগে থেকেই৷ এ ধরনের মাদ্রাসার শিক্ষাকে যুগোপযোগী করতে ২০১৩ সালের ১৫ এপ্রিল কওমি মাদ্রাসা শিক্ষা কমিশন গঠন করা হয়৷ কওমি মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডের সভাপতি ও চট্টগ্রামের হাটহাজারী মাদ্রাসার মহাপরিচালক মাওলানা শাহ আহমদ শফীকে চেয়ারম্যান করে ১৭ সদস্যের কমিশন গঠন করা হয়৷ শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে ঐ বছরের ২৮ আগস্ট ‘কওমি মাদ্রাসা শিক্ষা কর্তৃপক্ষ আইন-২০১৩' মন্ত্রিসভায় উঠানো হয়৷ যদিও মন্ত্রিসভা সেই আইনের খসড়া প্রত্যাহার করা৷ শেষ পর্যন্ত ১১ এপ্রিল শাহ আহমদ শফীর শর্ত মেনে নিয়ে তাঁর উপস্থিতি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কওমি মাদ্রাসা শিক্ষা ব্যবস্থাকে সরকারি স্বীকৃতি দেওয়ার ঘোষণা দেন৷ কিন্তু কওমি মাদ্রাসা শিক্ষা সংস্কারে যে কমিশন হয়েছে, আহমদ শফীর নেতৃত্বে তাতে সরকারের কোনো প্রতিনিধি নেই৷

বাংলাদেশ শিক্ষা তথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরোর (ব্যানবেইস) সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, সারা দেশে ১৩ হাজার ৯০২টি কওমি মাদ্রাসায় বর্তমানে প্রায় ১৪ লাখ শিক্ষার্থী পড়াশোনা করছে৷ কিন্তু বাস্তবে এই সংখ্যা আরো বেশি৷ তাছাড়া মাওলানা শাহ আহম শফীর নেতৃত্বে কওমি শিক্ষাবোর্ড সর্ববৃহৎ হলেও, এর বাইরে আরো পাঁচটি কওমি শিক্ষাবোর্ড আছে, যারা স্বাধীনভাবে মাদ্রাসা এবং কওমি শিক্ষা পরিচালনা করেন৷

কওমি শিক্ষা ব্যবস্থা মূলত কোরান হাদিস ভিত্তিক৷ ভাষা হিসেবে আরবি, ফার্সি এবং উর্দুকে প্রাধান্য দেওয়া হয়৷ তবে আজকাল প্রাথমিক পর্যায়ে বাংলা, ইংরেজি, বিজ্ঞান, ইতিহাস, গণিত এবং ভূগোল পড়ানো হয়৷ এই শিক্ষা ব্যবস্থাকে কওমি শিক্ষাবিদরা বিশেষায়িত শিক্ষা হিসেবে দেখেন৷ কোরান হাদিস এবং ফিকাহ বিষয়ে দক্ষতা অর্জনই এর মূল লক্ষ্য৷ আরবি এবং উর্দু সাহিত্যও পড়ানো হয়৷

বাংলাদেশের প্রধানত মসজিদকে কেন্দ্র করেই কওমি মাদ্রাসাগুলো গড়ে উঠেছে৷ এই মাদ্রাসার ছাত্ররা প্রধানত আবাসিক৷ লিল্লাহ বোডিং-এর আওতায় তাদের থাকা, খাওয়া এবং পড়াশুনার খরচ মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষই বহন করে৷ তবে তারা সরকারি কোনো সহযোগিতা বা অনুদান নেয় না৷ মুসলামানদের জাকাত, ফিতরা, কোরাবানির চামড়া, অনুদানের টাকায়ই মাদ্রাসাগুলো পরিচালিত হয়৷

এই শিক্ষা ব্যবস্থার যে কোনো পর্যায় থেকে সাধারণ শিক্ষার সমমানে প্রবেশের সুযোগ নেই৷ তাছাড়া বিজ্ঞান, মানবিক ও বাণিজ্য বিভাগ বলতে কিছু নেই৷ সর্বোচ্চ দাওরায়ে হাদিস শ্রেণিতে হাদিসের ওপর ১০টি বিষয় পড়ানো হয় আরবিতে৷ আর একেই মাস্টার্সের সমমান ঘোষণা করা হয়েছে৷

আগামী ১৫ মে সরকারি স্বীকৃতির পর প্রথম দাওরায়ে হাদিসের প্রথম পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হবে৷ দাওরায়ে হাদিসের সনদের মান বাস্তবায়ন কমিটির সদস্য মাওলানা মাহফুজুল হক ডয়চে ভেলেকে জানান, ‘‘ছয়টি কওমি শিক্ষা বোর্ডকে এক করে এই পরীক্ষা হবে৷ এ জন্য একটি কমিটি হয়েছে৷ ঐ কমিটি সার্টিফিকেট দেবে৷''

তিনি বলেন, এক্ষেত্রে অন্যান্য স্তরের সঙ্গে মান সমন্বয়ের কোনো প্রয়োজন নাই৷ সেটা করা হলে মাঝখান থেকে ছাত্ররা চলে যাবে৷ দেশে কোরান-হাদিসে শিক্ষিত দক্ষ আলেমের অভাব আছে৷ আমাদের টার্গেট দক্ষ আলেম তৈরি করা৷ ডাক্তার-ইঞ্জিনিয়ার তৈরি করা আমাদের কাজ নয়৷''

আরেক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘‘সরকারি অর্থ সহায়তা নিলে সরকার নিয়ন্ত্রণ করতে চাইবে৷ তাতে দ্বীনি বা ইসলামের শিক্ষা ক্ষতিগ্রস্ত হবে৷ তাই আমরা সরকারে অনুদান নেব না৷''

ঢাকার জামিয়া ইসলামিয়া ওয়াহিদিয়া মাদ্রাসার শিক্ষক মাওলানা আতাউল্লাহ আমিন বলেন, ‘‘আমাদের টার্গেট কোরান-হাদিসে শিক্ষিত আলেম গড়ে তোলা৷ এটা একটি বিশেষায়িত শিক্ষা৷ প্রথম থেকেই তাই কওমি মাদ্রাসার ছাত্রদের ওই বিষয়গুলোই পড়ানো হয়৷ যাদের আগ্রহ আছে তারা পড়বেন৷ অন্য বিষয়ে পড়শুনা করার জন্য তো আলাদা শিক্ষা প্রতিষ্ঠান আছে৷''

তিনি বলেন, ‘‘তবে এখন প্রথমদিকে বাংলা, ইতিহাস, ভুগোলের মতো কিছু বিষয় পড়ানো হয়৷''

এই উপমহাদেশে ১৭৮০ সালে ১ অক্টোবর সনে ব্রিটিশ সরকার কলকাতা আলিয়া মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা করে৷ তারাই আলীয়া মাদ্রাসা শিক্ষা ব্যবস্থার প্রবর্তক৷

আলিয়া মাদ্রাসায় কোরান, হাদিস, আরবি ভাষা ও সাহিত্যসহ ইসলামের মৌলিক বিষয়ের পাশাপাশি বাংলা, ইংরেজি, গণিত, বিজ্ঞান, ইতিহাস, অর্থনীতি, পৌরনীতি, রাষ্ট্রবিজ্ঞান, কৃষি, কম্পিউটার, কারিগরি প্রভৃতি বিষয় শেখানো হয় বাধ্যতামূলভাবে৷ এই শিক্ষা ব্যবস্থায় আধুনিক শিক্ষা ব্যবস্থার সঙ্গে সমন্বয় করা হয়েছে ধারাবাহিভাবে৷ যদিও শুরুতে তা ছিল না৷

অডিও শুনুন 04:13

‘এখানো কমার্স বা বাণিজ্য শিক্ষা চালু হয়নি’

বাংলাদেশে বর্তমানে ইবতেদায়ী মাদ্রাসার সংখ্যা ৬,৮৮২টি, দাখিল মাদ্রাসা ৯,২২১টি, আলিম মাদ্রাসা ২,৬৮৮টি৷ ফাযিল মাদ্রাসা ১,৩০০টি ও কামিল মাদ্রাসা ১৯৪টি৷ এই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোকে কেন্দ্র করেই আলিয়া মাদ্রাসা শিক্ষা ব্যবস্থা পরিচালিত হয় সরকারের নিয়ন্ত্রণে৷ সরকারি মাদ্রাসা যেমন আছে তেমনি এমপিওভুক্ত মাদ্রাসাও আছে৷ আলিয়া মাদ্রাসার প্রতিটি ক্লাসই সাধারণ শিক্ষার সঙ্গে মান ঠিক করা আছে৷ ১৯৮৫ সালে দাখিল এসএসসি সমমানের সরকারি স্বীকৃতি লাভ করে৷ ১৯৮৭ সালে আলিম এইচএসসি সমমান৷ আর ২০০৬ সালে ফাযিলকে স্নাতক এবং কামিল স্নাতকোত্তর বা মাস্টার্সের সমান মানের ডিগ্রির মর্যাদা দেয়া হয়৷ ২০১১-১২ শিক্ষাবর্ষ মাদ্রাসায় ফাযিল স্নাতক অনার্স কোর্স চালু হয়৷

আলিয়া মাদ্রাসা থেকে বিভিন্ন পর্যায়ে সাধারণ শিক্ষায় প্রবেশের সুযোগ আছে৷ বিশেষ করে আলিম বা এইচএসসি পাশের পর ছাত্ররা চাইলে বিশ্ববিদ্যালয় বা কলেজে ভর্তি হতে পারেন৷ সরকারের মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডের মাধ্যমে  আলিয় মাদ্রাসাগুলো পরিচালিত হয়৷ এগুলো শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীনে৷

ইসলামিক ফাউন্ডেশনের পরিচালক এবং আলিয়া মাদ্রাসা শিক্ষা ব্যবস্থার গবেষক ড. সৈয়দ শাহ এমরান নিজেও আলিয়া মাদ্রাসায়া পড়াশুনা করেছেন৷ তিনি ডয়চে ভেলেকে বলেন, ‘‘বর্তমানে আলিয়া মাদ্রাসা শিক্ষা ব্যবস্থা আধুনিক শিক্ষার সমন্বয় করা হয়েছে৷ সরকারি এই শিক্ষা ব্যবস্থায় ইসলামি শিক্ষার সঙ্গে সাধারণ শিক্ষার সিলেবাসের বিজ্ঞান এবং মানবিক বিষয় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে৷ আর আলিয়া মাদ্রাসার শিক্ষার্থীদের যে কোনো পর্যায়ে সাধারণ শিক্ষা ব্যবস্থার শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পড়ার সুযোগ আছে৷ এখান থেকে পাশ করে চিকিৎসা, প্রকৌশলসহ  ও সামাজিক বিজ্ঞানসহ সব ধরনের বিষয় পড়ার সুযোগ আছে৷ কিন্তু এখানো কমার্স বা বাণিজ্য শিক্ষা চালু হয়নি৷ তবে সেটারও চেষ্টা চলছে৷''

তিনি বলেন, ‘‘২০১০ সালের শিক্ষানীতিতে আলিয়া মাদ্রাসা শিক্ষা ব্যবস্থায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়৷ এটি সম্পূর্ণভাবে সরকার নিয়ন্ত্রিত এবং পরিচালিত একটি শিক্ষা ব্যবস্থা৷ শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীনে মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ড এর কোর্স এবং কারিকুলাম নির্ধারণ করে৷ সাধারণ শিক্ষায় বিভিন্ন ক্লাসে যে বই পড়ানো হয়, এখানেও তাই৷ আমি বলতে পারি যে, আলিয়া মাদ্রাসা শিক্ষা ব্যবস্থায় শিক্ষার্থীরা ইসলমী শিক্ষায় শিক্ষিত হওয়ার পাশাপাশি সাধারণ শিক্ষায়ও শিক্ষিত হয়৷ এছাড়া ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে আছে উচ্চশিক্ষার ব্যবস্থাও৷''

অডিও শুনুন 02:56

‘ছয়টি কওমি শিক্ষা বোর্ডকে এক করে এই পরীক্ষা হবে’

শিক্ষাবিদ এবং সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা রাশেদা কে চৌধুরী ডয়চে ভেলেকে বলেন, ‘‘আলিয়া মাদ্রাসা শিক্ষা ব্যবস্থা ২০১০ সালের শিক্ষা নীতির আলোকেই চলছে৷ এই শিক্ষা ববস্থা সরকারি এবং সরকারের নিয়ন্ত্রণেই আছে৷ তাই আধুনিক শিক্ষার সঙ্গে মিলিয়েই এর কোর্স বা কারিকুলাম তৈরি হয়েছে৷ কিন্তু কওমি শিক্ষা ব্যবস্থার ওপর সরকারের কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই৷ এর কারিকুলাম তৈরিতে সরকার বা রাষ্ট্রের কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই৷ এটা কীভাবে সম্ভব?''

তাঁর কথায়, ‘‘সরকার হঠাৎ করেই কওমি মাদ্রাসার একটি কোর্সকে মাস্টার্সের সমমান ঘোষণা করল৷ এটা করার আগে কোনো গবেষণা হয়েছে? কোনো তথ্য নেওয়া হয়েছে যে ঐ কোর্সটি মাস্টার্সের সমমানের কিনা? দাওরায়ে হাদিসকে মাস্টার্সের সমমান করা হলে আগের ধাপগুলোর মর্যাদা কী?''

তিনি আরো বলেন, ‘‘সরকারের নিয়ন্ত্রণের বাইরে বা মনিটরিং-এর বাইরে একটি শিক্ষা ব্যবস্থা চলতে পারে না৷ তাদের অর্থের উৎস কী? তারা কী পড়ায়? পড়ানোর মান কেমন? এ সব সরকারের নিয়ন্ত্রণের বাইরে থাকতে পারে না৷ ২০১০ সালের শিক্ষানীতিতে শিক্ষায় বৈষম্য কমানোর কথা বলা হয়েছে৷ কিন্তু করা হচ্ছে ঠিক উল্টো৷''

আপনার কি কিছু বলার আছে? লিখুন নীচের মন্তব্যের ঘরে৷

নির্বাচিত প্রতিবেদন

ইন্টারনেট লিংক

এই বিষয়ে অডিও এবং ভিডিও

সংশ্লিষ্ট বিষয়