অর্থনীতি কি রাজনীতির কাছে পরাজিত হবে? | আলাপ | DW | 01.01.2018
  1. Inhalt
  2. Navigation
  3. Weitere Inhalte
  4. Metanavigation
  5. Suche
  6. Choose from 30 Languages

বাংলাদেশ

অর্থনীতি কি রাজনীতির কাছে পরাজিত হবে?

সব কিছু ঠিকঠাক থাকলে ২০১৯ সালের জানুয়ারি মাসের মধ্যে সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে বাংলাদেশে৷ তাই বিশ্লেষকরা ২০১৮ সালকে নির্বাচনের বছর বলছেন৷ আর এই নির্বাচনের বছরে অর্থনীতি কেমন হবে, তা নির্ভর করছে রাজনীতির ওপর৷

বাংলাদেশ

ফাইল ছবি

বাংলাদেশে পরবর্তী সাধারণ নির্বাচনের প্রতি বরাবরের চেয়ে এবারের আগ্রহ অনেক বেশি৷ এটা রাজনৈতিক দল ও দেশের সাধারণ মানুষের মধ্যে যেমন, তেমনই আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় ও উন্নয়ন সহযোগীদের মধ্যেও৷ কারণ ২০১৪ সালের সাধারণ নির্বাচন ছিল একতরফা৷ ঐ নির্বাচনে দেশের প্রধান রাজনৈতিক দল বিএনপি এবং তাদের জেটের শরিকরা অংশ নেয়নি৷ ফলে আওয়ামী লীগ ও তার সহযোগীরা একতরফাভাবে নির্বাচনে জয় পায়৷ এমনকি ১৫৪ আসনে কোনো নির্বাচনেরই প্রয়োজন হয়নি, প্রার্থীরা বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হন৷

বিএনপি নিরপেক্ষ নির্দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচনের দাবিতে নির্বাচন বয়কট করে৷ কিন্তু তখন ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ সেই দাবি না মেনে সংবিধান এবং সাংবিধানিক ধারাবাহিকতার কথা বলে নির্বাচন অনুষ্ঠান করে৷ সেই নির্বাচন বর্জনই নয়, নির্বাচন ঠেকাতে বিএনপি ও তার সহযোগী জামায়াত দেশে ব্যাপক সহিংসতা চালায়৷ অভিযোগ অন্তত এমনটাই৷

ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ এবং বিএনপির মধ্যে নির্বাচনকালীন সরকার নিয়ে এখনো দূরত্ব প্রবল৷ কিন্তু একটি সুষ্ঠু এবং অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন নিয়ে কোনো মতবিরোধ নেই৷ আওয়ামী লীগ বলছে, নির্বাচন হবে সংবিধান অনুয়ায়ী বর্তমান সরকারের অধীনে৷ আর বিএনপির দাবি, নির্দলীয় নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচন৷

কিন্তু এই দাবি নিয়ে যত দূরত্বই থাকুক না কেন, নির্বাচনটা এখন দুই বড় দলের জন্যই প্রয়োজন৷ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞানের সহযোগী অধ্যাপক এবং রাজনৈতিক বিশ্লেষক ড. শান্তনু মজুমদার ডয়চে ভেলেকে বলেন, ‘‘২০১৪ সালের মতো নির্বাচন বর্তমান ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগও চায় না৷ কারণ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় এবং উন্নয়ন সহযোগীদের কাছে আগামী নির্বাচন গ্রহণযোগ্য করতে হলে আগামী নির্বাচন হতে হবে অংশগ্রহণমূলক৷ তাই সবদলের অংশগ্রহণে একটি সুষ্ঠু এবং নিরপেক্ষ নির্বাচনের চাপ আছে ২০১৪ সালের নির্বাচনের পর থেকেই৷ এছাড়া বিএনপি এবার নিজে থেকেই নির্বাচনের বাইরে থাকবে না দলের স্বার্থে৷ কারণ বিএনপি যে ধরনের দল, তাতে দীর্ঘদিন সংসদ বা ক্ষমতার বাইরে থাকলে তাদের অস্তিত্বই নড়বড়ে হয়ে পরতে পারে৷''

তাই তিনি বলেন, ‘‘২০১৮ সাল নির্বাচনের বছর৷ দেশের রাজনীতিতে নির্বাচন প্রাধান্য বিস্তার করবে৷ দুই দলই চাইবে তাদের অবস্থান সংহত করতে৷ দুই দলই চাইবে দর কষাকষির মাধ্যমে নির্বাচনে সুবিধা নিতে৷ দুই দলই চাইবে ক্ষমতা৷ তবে এই দ্বন্দ্ব উত্তাপ ছড়ালেও অতীতের মতো সহিংস হবে বলে মনে হয় না৷ কারণ নির্বাচন না হলে তা দু'পক্ষের জন্যই ক্ষতিকর হতে পারে৷''

এই রাজনীতির সঙ্গে গভীর সম্পর্ক রয়েছে অর্থনীতিরও৷ রাজনীতির আকাশে মেঘ থাকলে তা অর্থনীতিকেও মেঘাচ্ছন্ন করে৷ তাছাড়া গণতান্ত্রিক চর্চা অর্থনীতিকেও বেগবান করে৷

এবার মোট দেশজ উৎপাদনে (জিডিপি) লক্ষ্যমাত্রার চেয়েও বেশি প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছে বাংলাদেশ৷ বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো বা বিবিএস-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০১৬-১৭ সালে জিডিপিতে প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৭ দশমিক ২৮ শতাংশ, যেখানে লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৭ দশমিক ২৷ অর্থাৎ এ বছর ২০১৫-১৬ সালের তুলনায় ০ দশমিক ১৭ ভাগ বেশি প্রবৃদ্ধি হয়েছে৷ ফলে জিডিপির আকার বেড়ে হয়েছে ২৫০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার৷ বাংলাদেশের মানুষের এখন মাথাপিছু আয় ১ হাজার ৬১০ মার্কিন ডলার৷ বাংলাদেশি মুদ্রায় যার পরিমাণ প্রায় ১ লাখ ২৮ হাজার ৮০০ টাকা৷

অডিও শুনুন 07:03

‘বিএনপি এবার নিজে থেকেই নির্বাচনের বাইরে থাকবে না দলের স্বার্থে’

কৃষি খাতে ২ দশমিক ৯০ শতাংশ, শিল্প খাতে ১০ দশমিক ২২ শতাংশ এবং সেবা খাতে ৬ দশমিক ৬৯ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হয়েছে৷ অথচ এবার বন্যা ও অতিবৃষ্টির কারণে ৯ লাখ টন ধান উৎপাদন কম হয়৷

শিল্পখাতে প্রবৃদ্ধি কমেছে৷ ২০১৫-১৬ সালে এই খাতে প্রবৃদ্ধি ছিল ১১ দশমিক ০৯ ভাগ৷ এবার প্রবৃদ্ধি হয়েছে ১০ দশমিক ২২ ভাগ৷ সরকারি বিনিয়োগ বেড়েছে শতকরা ০ দশমিক ৭৫ ভাগ৷ তবে এডিপি বাস্তবায়নের হার কমেছে৷

কিন্তু সেবাখাতে প্রবৃদ্ধি আগের বছরের তুলনায় এ বছর বেশি হয়েছে৷ সংখ্যার বিচারে ৬ দশমিক ৫৯ ভাগ, ২০১৫-১৬ সালে যা ছিল ৬ দশমিক ২৫ ভাগ৷

জিডিপিতে এখন কৃষির অবদান ১৪ দশমিক ৭৪ ভাগ আর সেবাখাতের অবদান ৫২ দশমিক ৫৮ ভাগ৷ ফলে সেবাখাত এখন বাংলাদেশের জিডিপির নির্ণায়কের ভূমিকায় চলে গেছে৷

বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন নিয়ে সম্ভাবনার কথা তুলে ধরেছে ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরাম৷ সম্প্রতি বাংলাদেশের অর্থনীতির বিভিন্ন মাপকাঠি প্রকাশের পাশাপাশি উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করে একটি তথ্যচিত্রও তৈরি করেছে তারা৷ তাতে বাংলাদেশকে ‘নতুন এশিয়ান টাইগার' হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে৷

ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের তথ্যচিত্রে বলা হয়েছে, গত ১০ বছরে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে প্রতিবছরই গড়ে ছয় শতাংশ করে প্রবৃদ্ধি অর্জিত হয়েছে৷ এ প্রবৃদ্ধির অধিকাংশই টেক্সটাইল শিল্প থেকে এসেছে৷ বাংলাদেশের রপ্তানি আয়ের ৮০ শতাংশই এসেছে তৈরি পোশাক থেকে৷ ইউরোপের বাজারে চীনের ‘লো এন্ড' শিল্প খাতের ৬৬ শতাংশ এখন বাংলাদেশ নিয়ে নিয়েছে৷ বাংলাদেশের সম্ভাবনা রয়েছে ম্যানুফ্যাকচারিং ও ইলেক্ট্রনিক্স শিল্পেও৷

বিভিন্ন ক্ষেত্রে উন্নতি করলেও কিছু বাধা দূর করতে পারলে বাংলাদেশের আরও অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি সম্ভব৷ এর মধ্যে রয়েছে বিনিয়োগের পরিবেশ ও অবকাঠামো উন্নয়ন৷ বলা হয়েছে, বর্তমানে বিদ্যুৎ সংযোগ পেতে ৪০০ দিন সময় লাগে৷ দেশের ২০ শতাংশ এলাকায় স্থিতিশীল বিদ্যুৎ সংযোগ নেই৷

অডিও শুনুন 06:03

’আমাদের দেখতে হবে রাজনীতির কাছে যেন অর্থনীতি পরাজিত না হয়’

এছাড়া উচ্চমাত্রায় দুর্নীতির কারণেও ব্যবসা-বাণিজ্য করা কঠিন৷ কিছু প্রতিবন্ধকতার পরও বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সম্ভাবনা অত্যন্ত ভালো৷ বিদেশি বিনিয়োগকারীদের বাংলাদেশের প্রতি আগ্রহ ক্রমে বাড়ছে৷ এ সবকিছুই হচ্ছে বাংলাদেশের অর্থনীতির দ্রুত বিকাশমান গতির কারণে৷

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. সেলিম রায়হান সম্প্রতি তাঁর এক নিবন্ধে বাংলাদেশের অর্থনীতির গতি প্রকৃতি তুলে ধরেছেন৷ তিনি বলছেন, ১৯৯০ সালে শীর্ষ অর্থনীতির আকারের তালিকায় বাংলাদেশের অবস্থান ছিল ৫০৷ ২০১৫ সাল নাগাদ বাংলাদেশ ৩১তম স্থানে চলে আসে৷ অর্থনীতির পূর্বাভাষে বলা হচ্ছে, ২০৩০ সালের মধ্যে বাংলাদেশ পৃথিবীতে ২৮তম বৃহত্তম অর্থনীতি এবং ২০৫০ সালের মধ্যে ২৩তম বৃহত্তম অর্থনীতিতে পরিণত হবে৷

সপ্তম পঞ্চবার্ষিকি পরিকল্পনা অনুযায়ী, ২০২০ সালের মধ্যে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির হার ৮ শতাংশ লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করার কথা৷ সরকারি নানা পরিকল্পনা অনুযায়ী ২০৩০ সাল নাগাদ প্রবৃদ্ধির হার ৯-১০ শতাংশ হওয়ার কথা৷ টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার (এসডিজি) আলোকে ২০৩০ সালের মধ্যে অনেক কঠিন অর্থনৈতিক, সামাজিক ও পরিবেশগত লক্ষ্য অর্জনের কর্মসূচি রয়েছে৷

নির্বাচিত প্রতিবেদন

বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান বা বিআইডিএস-এর অর্থনীতিবিদ ড. নাজনীন আহমেদ ডয়চে ভেলেকে বলেন, ‘‘শতকরা ৭ ভাগের ওপর প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছি আমরা গত দু'বছরে৷ তাতে বাহ্যিকভাবে আমাদের মনে হবে অর্থনেতিক সূচকগুলো ভালোভবেই কাজ করছে৷ কিন্তু আমরা যদি কৃষি উৎপাদন দেখি তাহলে দেখব যে, ২০১৭ সালে কৃষিপণ্যের, বিশেষ করে চালের দাম আমরা নিয়ন্ত্রণে রাখত পারিনি৷ চালের যে দাম বেড়েছে, তা কিন্তু আর কমেনি৷ হাওড়ের বন্যা সহ প্রাকৃতিক দুর্যোগে ধানের উৎপাদন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে৷ আমি মনে করি, ২০১৮ সালে চালের দাম অর্থনীতির জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ হবে৷ রপ্তানি বাণিজ্যেও চ্যালেঞ্জ থাকবে৷ এই চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় আমাদের তৈরি পোষাক শিল্পে যে উন্নয়ন ঘটেছে বিশ্বব্যাপী তার প্রচার প্রচারণা দরকার৷''

তিনি বলেন, ‘‘আর্থিক খাতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার একটা চেষ্টা এখন দেখা যাচ্ছে৷ ব্যাংকগুলোর আর্থিক দুর্নীতি বন্ধের একটা তৎপরতা লক্ষ্য করা যায়৷ খেলাপি ঋণের পরিমাণ কমিয়ে আনার কথা বলা হচ্ছে৷ এগুলো যেন বাস্তবেই হয়৷ আর রোহিঙ্গার চাপ অর্থনীতিতেও পড়বে৷ তবে এর ইতিবাচক দিক আছে৷ সেটা আর্থিক সহায়তার বিষয় নয়৷ আন্তর্জাতিক সম্পর্ক এবং অর্থনৈতিক সম্পর্ক আরো সম্প্রসারিত করার সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে এতে৷''

তবে ড. নাজনীন মনে করেন, ‘‘রাজনীতির ওপর নির্ভর করছে অর্থনীতি৷ ২০১৮ নির্বাচনের বছর৷ আমাদের দেখতে হবে রাজনীতির কাছে যেন অর্থনীতি পরাজিত না হয়৷ তা যদি না হয়, তাহলে আমাদের অর্থনীতির সামনের দিনগুলো সম্ভাবনাময়৷''

ড. শান্তনু মজুমদার মনে করেন, ‘‘এবার সহিংসতা নয়, দুই প্রধান রাজনৈতিক দলই নির্বাচন চায়, নির্বাচনে থাকতে চায়৷ তাই নির্বাচন বাধাগ্রস্ত হয় তেমন কিছু তারা করবে না৷ তারা চেষ্টা করবে ক্ষমতা ধরে রাখতে বা ক্ষমতায় যেতে৷ আর সেটা নিয়েই হয়ত রাজনীতি ২০১৮ সালে আরো মুখর হবে৷''

এ বিষয়ে আপনার কোনো মন্তব্য থাকলে লিখুন নীচে মন্তব্যের ঘরে৷

নির্বাচিত প্রতিবেদন

এই বিষয়ে অডিও এবং ভিডিও

সংশ্লিষ্ট বিষয়