1. Inhalt
  2. Navigation
  3. Weitere Inhalte
  4. Metanavigation
  5. Suche
  6. Choose from 30 Languages

সমাজ সংস্কৃতি

অন্তঃপুরে এক নারীর দু’বছরের সংগ্রাম

আয়নায় নিজের মুখ দেখেননি দু’বছর৷ লম্বা একটা সময় খেয়েছেন শুধু ঘাস-লতা-পাতা৷ মৃত্যু আতঙ্ক আর প্রিয়জন হারানোর বেদনা ভুলতে আশ্রয় খুঁজেছেন বই-পুস্তকে৷ এক মাস হলো স্বাভাবিক জীবনে ফিরেছেন জিনাত আখরাস৷

বয়স ৬৫ বছর৷ এ বয়সে শরীরে ভাঙন দেখা দেয়া স্বাভাবিক৷ তবে সিরিয়ার হোমস নগরীর এ নারীর দেহ শুকিয়ে প্রায় কঙ্কাল হওয়ার কারণ অনাহার৷ দু'বছর কিছুই যে খাননি তা ঠিক নয়৷ সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট বাশার আল-আসাদের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ হোমসেই প্রথম শুরু হয়েছিল৷ ২০১১ সালের মার্চে শুরু হয় বিক্ষোভ৷ আসাদবিরোধীদের নিয়ন্ত্রণে আনতে সেনা মোতায়েন করা হলে শুরু হয় যুদ্ধ৷ সেই থেকে দু'বছর হোমস ছিল যুদ্ধের শহর৷ শহরে অক্ষত ভবন খুঁজে পাওয়া মুশকিল৷ আল-মালজায় জিনাত আখরাসের বাসভবনটিও এখন ক্ষতবিক্ষত৷

শেলের আঘাতে নিজেদের বাড়ির ছাদের একাংশ, দেয়ালের কয়েকটি জায়গা ভেঙে পড়ার দৃশ্য বেশ কয়েকবারই দেখেছেন জিনাত৷ সঙ্গে ছিলেন দুই ভাই আনাস আর আয়ান৷ শহরের অধিকাংশ বাসিন্দার মতো কখনো কখনো তাঁদেরও নিরাপদ আশ্রয়ের সন্ধান খোঁজার ইচ্ছে হতো৷

কিন্তু একবার ঘর ছাড়লে বিদ্রোহীরা সব দখল করে নেবে – এই ভয়ে ভাই-বোন জীবন হাতে নিয়ে থেকেছেন দুটি বছর৷ ওষুধের পারিবারিক ব্যবসা লাটে উঠেছে৷ বিদ্রোহীরা দোকানে লুটতরাজ চালিয়েছে একাধিকবার৷ দীর্ঘদিন বন্দিদশায় থাকতে হতে পারে – জেনে ঘরে যেটুকু খাবার সংগ্রহ করে রেখেছিলেন, সেই খাবারও বেশিদিন রাখতে পারেননি জিনাত আর তাঁর দুই ভাই৷ বন্দুকের মুখে কয়েক দফায় সব নিয়ে যায় বিদ্রোহীরা৷

তবে বার্তা সংস্থা এপি-কে জিনাত আখরাস জানিয়েছেন, বিদ্রোহীরা কখনো তাঁর সঙ্গে অবমাননাকর আচরণ করেনি৷ ঘরে খাবার ছিল বলেই প্রাণের সঙ্গে মানটুকুও রক্ষা করতে পেরেছেন বলে তাঁর ধারণা৷

দু'বছরে মাত্র বার ছয়েক ঘরের বাইরে গিয়েছেন জিনাত আখরাস৷ গিয়েছেন মূলত ঘাস-লতা-পাতা সংগ্রহ করতে৷ সেগুলো রেঁধে খেয়েই বেঁচে থাকার চেষ্টা করেছেন তিন ভাই-বোন৷ খ্রিষ্টান পরিবারের সন্তান জিনাত বেঁচে থাকলেও এ দু'বছরে হারিয়েছেন অনেক কিছু৷ দু'বছর আগে দেখলেই বোঝা যেতো জিনাত স্বচ্ছল পরিবারের এক সুখী রমণী৷ ৫৮ কেজি ওজনের শরীর দেখে সুস্থ, সবলই মনে হতো৷ কিন্তু দু'বছর পর তাঁকে দেখে কেউ সুস্থ বলবেন না৷ এখন ওজন মাত্র ৩৮ কেজি৷ গত ৯ মে হোমস থেকে বেরিয়ে এসেছেন জিনাত৷ তখন ওজন ছিল ৩৪ কেজি৷ হওয়ারই কথা, কারণ, প্রায় না খেয়ে খেয়ে শরীর যে ভেঙে পড়েছিল!

মনের অবস্থা এমন হয়েছিল যে, এক সময় নিজের চেহারা আয়নায় দেখাও বাদ দিয়েছিলেন জিনাত৷ হোমসে যুদ্ধ পরিস্তিতিতে কোথাও বিদ্যুৎ সংযোগ ছিল না৷ সুর্য ডুবলেই অন্ধকারে ঢেকে যেত সারা শহর৷ সুর্যোদয় থেকে সুর্যাস্ত পর্যন্ত জেগে থাকতেন জিনাত৷ ওই সময়টুকু কাটতো রান্না করে আর বই পড়ে৷

গত জানুয়ারিতে ক্যানসারে আক্রান্ত ভাই আনাস বাড়ি ছেড়ে জাতিসংঘের আশ্রয় শিবিরে চলে যেতে বাধ্য হন৷ ঘর ছাড়ার ১৯ দিন পরই ক্যানসারের কাছে হার মানেন তিনি ৷ মা মারা গিয়েছিলেন যুদ্ধ শুরুর কয়েক মাস আগে৷ ছয় ভাই-বোনের মধ্যে এখন শুধু ভাই আয়ানই আছেন জিনাতের কাছে৷

৯ মে একটু ঘরের বাইরে যাবার ইচ্ছা হয়েছিল জিনাতের৷ সেদিন না বেরোলে গৃহবন্দী জীবনের কষ্ট হয়ত আরো দীর্ঘায়িত হতো৷ রস্তায় এক সিরীয় সেনার সঙ্গে দেখা৷ তাঁর কাছ থেকে চেয়ে একটি রুটি খেয়েছিলেন জিনাত৷ সেই রুটির স্বাদ কেমন ছিল জানাতে গিয়ে জিনাত বললেন, ‘‘আস্ত একটা রুটি খেয়ে ফেলেছিলাম৷ রুটিটা বড় মিষ্টি লাগছিল৷''

ঘাস-লতা-পাতা খেয়ে ক্ষিদে ভুলে যাওয়া জিনাত এখন আবার খেতে পারছেন৷ ধীরে ধীরে ফিরে পাচ্ছেন স্বাভাবিক স্বাস্থ্য৷ এক মাস আগের কথা ভাবলে এখনো তাঁর গা শিউরে ওঠে৷ নিজের চেহারা আয়নায় দেখার সাহস এতদিনে আবার ফিরে পাচ্ছেন৷ এক মাস আগে এই সাহসটুকুও ছিল না জানাতে গিয়ে জিনাত বললেন, ‘‘তখন আমি শুকিয়ে একেবারে শিশুর মতো ছোট হয়ে গিয়েছিলাম৷''

এসিবি/ডিজি (এপি, রয়টার্স)

নির্বাচিত প্রতিবেদন