1. Inhalt
  2. Navigation
  3. Weitere Inhalte
  4. Metanavigation
  5. Suche
  6. Choose from 30 Languages

বিশ্ব

অনেক ভালো মানুষের দেশে কিছু কাপুরুষের দাপাদাপি

‘মানুষ মানুষকে পণ্য করে' – গানটা প্রথমবার শুনে অবাক হয়েছিলাম৷ ধীরে ধীরে বুঝলাম, এ খুব স্বাভাবিক একটা সত্য৷ পরে জেনেছি, অনেক মানুষ শুধু মানুষ নয়, ধর্মকেও পণ্য করে৷ নিজের ধর্মকে ‘পণ্য' বা ‘অস্ত্র' করে তারা অন্যকে আঘাত করে৷

অন্যের বিশ্বাসেও তারা আঘাত করে৷ রাজনৈতিক বিশ্বাসে আঘাত করে৷ রাজনৈতিক বিশ্বাস বা আদর্শের কথা বলে, ধর্মের কথা বলে তারা অন্যের ধর্মেও আঘাত করে৷ কথায়, হাতে-হাতুড়িতে, ছোরা-চাকু-চাপাতিতেও আঘাত করে৷

ভারত- বাংলাদেশে এমন আঘাতের নমুনা আমরা অহরহ দেখছি৷ ভারতে তো ঘরে গরুর মাংস রাখার গুজব ছড়িয়ে এক প্রৌঢ় মুসলমানকে পিটিয়ে মেরে ফেলা হলো৷ সে দেশে এখনো এ নিয়ে তুমুল আলাচনা-সমালোচনা হচ্ছে৷ একটি অঞ্চলের কিছু মানুষ গরুর জন্য মানুষ হত্যার মতো অপকর্ম করলেও ভারতের অন্য প্রায় সব অঞ্চলেই কিন্তু এর নিন্দা-প্রতিবাদ হচ্ছে৷ সাম্প্রদায়িকদের তৎপরতা বেড়ে যাওয়ায় প্রধানমন্ত্রী মোদীর সারা বিশ্বে যে অনুকরণীয় ভাবমূর্তি গড়ে উঠেছে, তার ক্ষতি হবে বলেও বলা হচ্ছে৷

শুধু কথায় জোরালো প্রতিবাদ নয়, সেখানে সরকারের ওপর চাপ বাড়ানোর জন্য দৃষ্টান্তমূলক কাজও হচ্ছে৷ এক্ষুনি একটা খবর পড়ে অবাক এবং আনন্দিত হলাম৷ পাঞ্জাবের লেখিকা দলীপ কৌর তিওয়ানা জানিয়েছেন, তাঁকে সম্মান জানিয়ে রাষ্ট্রের দেয়া পদ্মশ্রী পুরস্কার তিনি রাষ্ট্রকে ফিরিয়ে দেবেন৷

উত্তর প্রদেশের ওই মুসলমান ভদ্রলোক এবং মহারাষ্ট্র ও কর্নাটকে মুক্তচিন্তার মানুষ হত্যার প্রতিবাদে রাষ্ট্রীয় পুরস্কার ফিরিয়ে দেবেন লেখক! দলীপ কৌর একা নন, বিজেপি সরকারের আমলে ভারতে সাম্প্রদায়িক ও জাতিগত অসহিষ্ণুতা বেড়ে যাওয়ায় সাহিত্য অ্যাকাডেমি পুরস্কারজয়ী ২০ জনেরও বেশি লেখক আগেই পুরস্কার ফিরিয়ে দিয়েছেন৷ তাঁদের একটাই কথা, যে দেশ সংখ্যালঘু এবং মুক্তচিন্তার মানুষদের নিরাপত্তা এবং সম্মান রক্ষা করতে পারে না সে দেশের পুরস্কার তাঁরা চান না৷

‘মানুষ মানুষকে পণ্য করে' আসলে ভূপেন হাজারিকার গাওয়া ‘মানুষ মানুষের জন্য' গানের একটি লাইন৷ গানের উল্লেখযোগ্য আরেকটি লাইন, ‘‘পুরোনো ইতিহাস ফিরে এলে লজ্জা কি তুমি পাবে না?'' বাঙালি হিন্দুদের দুর্গাপূজা শুরুর কয়েকদিন আগে ভূপেন হাজারিকার গানটি খুব বেশি মনে পড়ছে, কারণ, বাংলাদেশে আবার লজ্জা পাওয়ার মতো ইতিহাস ফিরে এসেছে, কিন্তু রাজনীতিবিদ এবং বুদ্ধিজীবীরা সম্ভবত খুব বেশি লজ্জা পাচ্ছেন না৷

হ্যাঁ, আবার পুজো এসেছে এবং বাংলাদেশে আবার ফিরে এসেছে পুরোনো ইতিহাস৷ গত ৪৪ বছরের ‘ইতিহাস' ঘাঁটুন, দেখবেন প্রতি বছরই পুজোর খবর আগে থেকেই প্রকাশ করেছে সংবাদমাধ্যম৷ এবারও তা হচ্ছে৷ ৪৪ বছর আগে সংবাদমাধ্যমের পরিসর ছোট ছিল, সংবাদের বৈচিত্র্য এবং সংখ্যাও তাই এত ছিল না৷ এখন অনেক ধরণের সংবাদপত্র, অনেক রেডিও স্টেশন, অনেক টেলিভিশন চ্যানেল, সোশ্যাল মিডিয়া আছে, তাই পুজোর প্রস্তুতির খবরও অনেক৷

আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে বেশ কিছুদিন ধরেই আসছে পুজোর খবর, পুজোর ছবি...৷পুরোনো ইতিহাসের মতো হিন্দুদের জীবনে পুজোর আনন্দের সঙ্গী হয়ে আতঙ্কও ফিরে আসছে৷ তবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলছেন, সারা দেশে দুর্গাপূজার সময় কঠিন নিরাপত্তা থাকবে৷ এ সব কথাও তো পুরোনো৷ প্রতিবছরই সরকারের তরফ থেকে এ সব শোনানো হয়৷

প্রতি বছর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মুখ খোলার আগেই শুরু হয়ে যায় মন্দিরে হামলা, মূর্তি ভাঙচুর৷ এবারও তা-ই হচ্ছে৷ কত পুরোনো ইতিহাস, তাই না, কিছুই নতুন নেই৷

পুজোর আগে, পুজোর সময়, এমনকি পুজোর পরেও যে মন্দিরে হামলা হবে, মূর্তি ভাঙা হবে, লুটপাট অগ্নি সংযোগ হবে – এ সব কে না জানে! সংখ্যালঘুদের সব উৎসবের আগে-পরেই তো এসব হয়৷ কয়েক মাস আগে জন্মাষ্টমীতেও হয়েছে৷

সবই পুরোনো ব্যাপার, পুরোনো ইতিহাস৷ তবে ইতিহাসের ছোট এবং তুলনামূলকভাবে কম আলোচিত অংশও আছে৷ এক সময় খুব বড় মুখ করে বলা হতো, ‘‘বাংলাদেশ সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির দেশ৷'' কথাটা বলতে এখন অনেকেরই একটু বাঁধে৷ তার মানে এই নয় যে, দেশের সাধারণ মানুষের মন থেকে সম্প্রীতি উধাও হয়ে গেছে৷ অপরাজনীতির কারণে সম্প্রীতির বন্ধন কোথাও কোথাও কিছুটা আলগা হয়ত হয়েছে, তবে ছিন্ন হয়ে যায়নি৷ এখনো এতিম মুসলিম শিশুকে হিন্দু দম্পতি নিজের সন্তানের মতো পেলে-পুষে মানুষ করতে গিয়ে দুর্ভোগ পোহান৷

এ বছর সারা দেশে ২৮ হাজার ৫০০ মণ্ডপে দুর্গাপূজা হবে৷ পুরোনো ইতিহাসের ধারাও যদি বজায় থাকে, তবুও দেশে মোট ৫০০ মণ্ডপেও যে হামলা হবে না তা আগে-ভাগে বলে দেয়া এখনো বোধহয় নিরাপদ৷ দেশে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি যদি যথেষ্ট না থাকতো তাহলে নিশ্চয়ই অনেক বেশি মন্দির, মণ্ডপ ক্ষতিগ্রস্ত হতো, অনেক বেশি মূর্তি ভাঙতো৷

Deutsche Welle DW Arun Chowdhury

আশীষ চক্রবর্ত্তী, ডয়চে ভেলে

সাধারণের সম্প্রীতি আসলে যারা খুব সাধারণ নন, তারাই বেশি নষ্ট করেন৷ তাঁরাই মানুষকে পণ্য করেন৷ ধর্মকেও পণ্য করেন তাঁরা৷ ভারত, পাকিস্তান, আফগানিস্তান বা আরো দূরের কোনো দেশেও তাঁরাই এ সব করেন৷

ভারতের সঙ্গে অবশ্য বাংলাদেশের একটা খুব বড় পার্থক্য এখনো বোধহয় আছে৷ বাংলাদেশের বুদ্ধিজীবীরা জাতীয় সংকটে জ্ঞান-বুদ্ধি যতটা বিতরণ করেন, সংকট নিরসনে আত্মত্যাগের নজির সেই তুলনায় তেমন একটা রাখেন না৷

ভারতে মৌলবাদীদের আস্ফালন রুখতে লেখকরা দল বেঁধে পুরস্কার ফিরিয়ে দেন৷ বাংলাদেশের বুদ্ধিজীবীরা অনেক বছর ধরেই অন্য পথের পথিক৷ তাই দুর্গাপূজায় বারবার পুরোনো ইতিহাসই ফিরে ফিরে আসে এবং তাতে অপরাজনীতিবিদ এবং বুদ্ধিজীবীদের খুব একটা লজ্জা হয় বলে মনে হয় না! তাই কিছু কাপুরুষ ধর্মান্ধ বা স্বার্থান্ধের দাপাদাপি প্রতিবছরই তারা দেখেন, মুখের কথা এবং কাজ কিন্তু বদলায় না!

ভারতে মুসলমানদের উপর হামলার প্রতিবাদে লেখকরা পুরস্কারও ফিরিয়ে দেন৷ বাংলাদেশে এমনটা হয় না কেন? উত্তর দিন নীচের মন্তব্যের ঘরে৷

নির্বাচিত প্রতিবেদন

সংশ্লিষ্ট বিষয়